এম. হুমায়ুন কবির একজন বাংলাদেশী কূটনীতিক এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত।তিনি ১৯৫২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। হুমায়ুন কবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেছেন।তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন প্রবীণ সৈনিক। তিনি ১৯৭৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৮০ সাল পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেন। হুমায়ুন কবির ১৯৮২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেন। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত তিনি পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৭ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত কবির যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসে দ্বিতীয় এবং তারপর প্রথম সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে প্রথম সচিব হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে দায়িত্ব পালন করেন।তিনি ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত কলকাতায় বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার হিসেবে কাজ করেন। ২০০১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত, তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বেশ কয়েকটি নেতৃত্বের পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি ২০০৩ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন এবং ২০০৬ সাল পর্যন্ত সেখানে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ২০০৬ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার ছিলেন। তিনি ২০০৭ সালের জুলাই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন এবং ২০১০ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সচিব পদে অবসর গ্রহণ করেন।তিনি বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এর পাশাপাশি তিনি বাওয়ার গ্রুপ এশিয়ার সিনিয়র উপদেষ্টা।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেক পুরানো এবং তা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।বাংলাদেশে বর্তমানে যে কয়টি ভাল প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলো তৈরিতে ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ অনুষদ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কিন সহায়তার নজির আছে৷ অর্থাৎ বলা যায় বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জায়গায় বলিষ্ঠ যোগাযোগ আছে। প্রতিবছর ৪ থেকে ৫ হাজার শিক্ষার্থী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চতর লেখাপড়ার জন্য যায়। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশকে সাহায্য করে আসছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। সিডরের সময় ৮০ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং সে সময় দুর্যোগ মোকাবেলা সংক্রান্ত প্রতিটি কাজে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করেছে। তবে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মিশ্র ফলাফল লক্ষণীয়। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের রপ্তানি সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। তবে শুল্কমুক্ত পণ্যের প্রবেশাধিকার চাওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্র সে সুবিধা বাংলাদেশকে দেয়নি। পাশাপাশি গার্মেন্ট সেক্টরে কিছু সমস্যার কারণে জিএসপি সুবিধাও তুলে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ব্যাপারে অনেক সহায়ক ছিল। তবে এরপরও বাণিজ্যে আমরা ভাল করছি এবং প্রতিযোগিতা করে টিকে আছি। এছাড়া ২০০৮ সালে বাংলাদেশকে দুই বিলিয়ন ডলার সহায়তা দিয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যার সাহায্যে আমরা ১৭ টি উড়োজাহাজ কিনেছিলাম। এছাড়া সামরিক ও নিরাপত্তা খাতেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে অনেক সহায়তা দিয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের জাহাজ দিয়েছে, নিয়মিত নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেয় এবং হেলিকপ্টার ক্রয় বিক্রয়ের ব্যাপারেও আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিটেন্স আসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
কোন প্রকল্পের ঋণ বা সহায়তা দেওয়ার আগে ডাটা গোষ্ঠীগুলো প্রথমে লক্ষ্য রাখে আমরা যে প্রকল্পের জন্য টাকা নিচ্ছি তা জনবান্ধব কিনা। এরপর তারা দেখে আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের রূপরেখা এবং সন্তোষজনক মনে হলে প্রাথমিকভাবে তারা আমাদের ঋণদানের জন্য আগ্রহী হয়। এরপর আরেকটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখে যে দায়বদ্ধতা ও সত্যতা বজায় রাখা যাবে কিনা। এ বিষয়টি ঋণ দানের ক্ষেত্রে দাতা গোষ্ঠীর নিকট অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রত্যেকটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি শুরু হয় দেশ থেকেই। দেশের বাস্তবতা মাথায় রেখে এই বৈদেশিক নীতি গ্রহণ করা হয়। ভারত আমাদের প্রতিবেশী দেশ সাথে আমাদের যোগাযোগ বেশি এবং এজন্য উভয় দেশের বৈদেশিক নীতির সকল বিষয় আমরা স্পষ্ট ভাবে অনুধাবন করতে পারি।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এবং সেজন্য ভারতের সাথে আমাদের একটি বিশেষ ভাবাবেগের জায়গা আছে। তবে জাতীয় স্বার্থের ক্ষেত্রে ভাবাবেগের থেকে যুক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভারত তাদের দেশের স্বার্থ সমুন্নত রাখার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ভাবাবেগ এবং ভৌগোলিক বিভিন্ন কারণে ভারতের কাছে থেকে আমাদের চাওয়া বেশি। ভারতের সাথে সাথে সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলো উন্নতি করতে পারলে তা ভারতের জন্য ইতিবাচক ফলাফল বয়ে আনবে। এজন্য ভারতের উচিত নিজেদের প্রয়োজনেই সহায়তার ক্ষেত্র বৃদ্ধি করা।
প্রযুক্তিগত উন্নতি বা ডিজিটালাইজেশনে আমাদের অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এই ডিজিটালাইজেশন বা প্রযুক্তিগত উন্নতির প্রভাব সমাজে পড়ে। প্রযুক্তি খাতে তরুণ প্রজন্ম আগ্রহী হলেও আগের প্রজন্ম খুব একটা আগ্রহী হয় না। ডিজিটালাইজেশন এর ফলে যাদের জ্ঞান বেশি তারাই প্রভাব বিস্তার করে। পাশাপাশি স্বল্প শিক্ষিত জনগোষ্ঠী পিছিয়ে পড়ে। তাই ডিজিটালাইজেশনের সাথে সাথে যথাযথ জ্ঞানের দরকার। ডিজিটালাইজেশনের এ প্রভাবগুলোর ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ভূমিকা না নিলে বৈষম্য বাড়বে আর এর সাথে সাথে দুর্নীতিও বাড়বে।
বাংলাদেশের মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে৷ ঠিক এ কারণেই ১৯৭১ সালের সময়কার ধ্বংসস্তূপ থেকে আমরা উঠে আসতে পেরেছি। এখন শহর আর গ্রামের মাঝে তেমন কোন পার্থক্য আর নেই। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে আমরা উন্নয়নশীল দেশের পরিণত হওয়ার দিকে ধাবিত হচ্ছি। তবে এ কারণে কিছু কিছু প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে। স্বল্পোন্নত দেশগুলো যে ধরনের সুবিধা পায় সে ধরনের সুবিধা থেকে আমরা বঞ্চিত হব। এতে করে বিশ্ববাজারে আমাদের প্রতিযোগিতা আরো বাড়বে।। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি করতে হবে। শিক্ষা, কৌশল ও শ্রমিক স্বার্থে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।
বিভিন্ন দেশে আটকে পড়া বা বিপদগ্রস্ত মানুষদের সহায়তায় কূটনৈতিকভাবে আমাদের আরো সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। যাদের কাছে ক্ষমতা আছে তাদের অবশ্যই বিদেশে বিপদগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা করা উচিত। কারণ দেশের বাইরে গেলে আমরা সবাই অসহায় হয়ে পড়ি। এজন্য সক্রিয়, মানবিক ও সংবেদনশীল হতে হবে কূটনৈতিকভাবে। সে পরিবেশ আনতে কাজ করতে হবে সবাইকে একসাথে।
লিখেছেনঃ রোমান উদ্দিন
