সামিউল ইসলাম পোলাক ও স্বপ্নীল সজীব: হাজার বছরের সংস্কৃতিতে তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব

সামিউল ইসলাম পোলাক ও স্বপ্নীল সজীব: হাজার বছরের সংস্কৃতিতে তারুণ্যের প্রতিনিধিত্ব

সামিউল ইসলাম পোলাক বাংলাদেশের একজন তরুণ জনপ্রিয় বাচিকশিল্পী। দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে তাঁর অনবদ্য স্বর দিয়ে তিনি শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং কবিতা আবৃত্তিকে একটি ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। রবীন্দ্র কাব্যে আবৃত্তিতে তার অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশে এবং এর বাইরেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা, সম্মান এবং খ্যাতি অর্জন করেছেন। শান্তিনিকেতনে পরমা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অধীনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পোলাক সম্পূর্ণ মহিমায় রবি ঠাকুরের কবিতা আবৃত্তি আয়ত্ত করেছেন। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে তাঁর সূক্ষ্মতা এবং বাগ্মীতা তাকে বহু প্রশংসা পদক এনে দিয়েছে যার মধ্যে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহের স্বর্ণপদক প্রাপ্তি তাঁর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার প্রতীক হিসাবে দাঁড়িয়েছে। পোলাক কাব্যকে বিশ্বব্যাপী দর্শকদের কাছে উপস্থাপন করার জন্য বিশ্বের নানা প্রান্তে ভ্রমণ করেছ এবং বাংলাদেশের জন্য গর্ব ও সম্মান বয়ে এনেছেনবাংলাদেশ থেকে জাতীয় স্বর্ণপদকের পাশাপাশি, তিনি “দ্য বেঙ্গল’স প্রাইড অ্যাওয়ার্ড”, “মিনার্ভা রবীন্দ্র পদক”, “কবি নজরুল পদক ২০২২”-এও সম্মানিত হন। অপরদিকে স্বপ্নীল সজীব তরুণ প্রজন্মের শিল্পী হিসেবে শ্রোতাদের কাছে এরই মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন। মাত্র ৫ বছর বয়সে মঞ্চে তাঁর গান গাওয়া শুরু। তাঁর খালা, উচ্চাঙ্গ সংগীতশিল্পী লুত্ফর নাহার লতার কাছে তাঁর গানের হাতেখড়ি হয়। এরপর ছায়ানটে রবীন্দ্রসংগীতে কোর্স করেছে, তালিম নিয়েছেন বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কাছে। লোকসংগীত গেয়ে ১৯৯৮ ও ২০০০ সালে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০১১ ও ২০১৩ সালে রবীন্দ্র সম্মেলনে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ২০১২ সালে ‘চ্যানেল আই নব গান নব প্রাণ’ প্রতিযোগিতায় টপ ফাইনালিস্ট হয়েছিলেন। ওই বছরই প্রকাশ পায় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘টেগোর ট্রেজারি’ এবং কলকাতা থেকে দ্বিতীয় একক অ্যালবাম ‘ভাঙা-গড়ায় রবীন্দ্রনাথ’। এছাড়া স্বপ্নীল সজীব বাংলাদেশ-ইন্টারন্যাশনাল ফেম অ্যাওয়ার্ড ২০২২’ অনুষ্ঠানে ২০২১ সালের শ্রেষ্ঠ সংগীতশিল্পী হিসেবে সম্মাননা গ্রহণ করেন।

সজীব জানান সঙ্গীতের জগতে এমন পথচলার জন্য তাকে নানা সময় নানা সংগ্রাম করতে হয়েছে এবং করে যেতে হচ্ছে। কখনো পরিবারের সাথে, কখনো সমাজের সাথে, এমনকি কখনো নিজের সাথেই নানা যুদ্ধ করতে হয়েছে। বর্তমান প্রজন্ম রবীন্দ্র, নজরুল এবং পঞ্চকবিদের গান নিয়ে খুবই কম আগ্রহ বোধ করে। এই প্রজন্মের কাছে এ ধরনের গান পৌঁছে দেয়ার তাড়না থেকেই তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের সাধনায় নিজেকে নিবেদন করেছেন। তিনি জানান, এখনো নানা সময় নানা ধরনের বিড়ম্বননায় পরতে হয়। অনুষ্ঠান করতে গিয়ে হয়তো নিজের মতো করে গাওয়ার সুযোগ পাননা, আয়োজকরা সেই কিছু ধরাবাধা গান করতে বলেন, কিংবা এমন প্রত্যাশা রাখেন যা তাঁর ব্যক্তিত্ব ও চর্চার পরিপন্থী। এর সাথে যোগ হয়েছে করোনা মহামারী, এই সব কিছু মিলিয়েই অনেক বাঁধার মুখোমুখি হয়েই তিনি নিজের সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আশা করছেন, এখন সবকিছু কাটিয়ে যে ধারায় আবার সবকিছু শুরু হয়েছে, তা বজায় রাখলে সামনে আরও ভালো ফলাফল আসবে। পোলাক বলেন, নিজের যাত্রাপথে তাকে খুব বেশি বাঁধার সম্মূখীন হতে হয়নি। ছোটবেলায় আবৃত্তি শুরু করার পর পড়াশোনা এবং অন্যান্য কাজের ভীড়ে একসময় এই চর্চা হারিয়ে যেতে বসেছিল। তারপর আবার শুরু করে আজকের এই অবস্থানে আসা। সে জন্যেই অনেকসময় পোলাক নিজেকে দুর্ঘটনাবশত হওয়া শিল্পী হিসেবে পরিচয় দেন। সে ব্যাপারে আবার আপত্তি জানিয়ে সজীব বলেন, পোলাক নিজের প্রতিভা এবং দীর্ঘসময়ের চেষ্টার ফলেই এক অসাধারাণ শিল্পী হয়ে উঠেছেন। এটা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং সাধনার ফসল। 

বাচিকশিল্পী হিসেবে পোলাক রবীন্দ্রনাথের বাইরে আর কিছু কেন আবৃত্তি করতে চান না, এমন প্রশ্নের জবাবে বলেন, যুগের তালে গা ভাসিয়ে দেয়া খুবই সহজ। কিন্তু কাউকে না কাউকে আমাদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির ধারক হয়ে তা বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এছাড়া, রবীন্দ্রনাথের কথা, শব্দ, মানুষের মাঝে নতুন বোধ সৃষ্টি করে, তাদেরকে আলোকিত করে। তিনি চান, তাঁর শ্রোতারা যাতে রবীন্দ্রনাথের বাণীর মাধ্যমেই আত্মোপলব্ধির সুযোগ পান। এখানে আরেকটি বড় ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ কোন সাহিত্যের মাঝে নিজেকে খুঁজে পায় তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পোলাক আধুনিক যুগের সাহিত্যের চাইতে, চরিত্রগুলোর চাইতে, রবীন্দ্র সাহিত্যেই নিজেকে বেশি করে খুঁজে পান। বর্তমানে দাঁড়িয়েও অতীতের সেই সময়ের মাঝে তিনি নিজেকে আরও প্রবলভাবে আবিষ্কার করেন। এভাবে নিজের চর্চার মধ্যে, পঠনের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়া তাঁর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সজীবও গলা মিলিয়ে বলেন, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁরও এক আত্মিক যোগ রয়েছে। তবে মজা ব্যাপার হল, তিনি দুবার জাতীয় পুরষ্কার কিন্তু পেয়েছেন লোকগীতিতেএছাড়া ইন্টারন্যাশনাল ফোক ফেস্টিভালে তিনি সত্তর হাজার দর্শকের মাঝেও ফোক গান গেয়েছেন। কিন্তু দর্শকের কাছে, আপনজনদের কাছে, তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের বরাবরই আলাদা কদর রয়েছে। সজীব বলেন, তিনি কিছু ভালো গান করে যেতে চান যা মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে, তাঁর নিজের প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করবে। এখানে রবীন্দ্রনাথের পাশাপাশি অন্য কবিদের কথাও তিনি নিজের কন্ঠে ফুটিয়ে তুলতে চান। এর বাইরে তিনি নিজের মৌলিক সৃষ্টির দিকেও এখন মনোযোগ দিতে চান এবং সর্বোপরি নিজের কাজের মাধ্যমে বাংলা ভাষাটাকে আরেকটু সমৃদ্ধ করে যেতে চান।

সামিউল ইসলাম পোলাক এবং স্বপ্নীল সজীব ব্যক্তিগতভাবে খুবই কাছের দুজন মানুষ। তাদের মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে অনুপ্রাণিত এক ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সবসময় বিরাজমান। সজীব জানান, এক দশকের বেশি সময় ধরে দুজন একসাথে থেকেছেন। পোলাক বড় ভাই এবং শিক্ষকের মতো তাকে সবসময় দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন, কোথায় গিয়ে কীভাবে কথা বলতে হবে, কী ধরনের ব্যবহার করতে হবে তা ধরে ধরে শিখিয়েছেন। পোলাক নিজেও বলেন, সজীব বয়সে অনেক ছোট হলেও গায়ক স্বপ্নীল সজীবের প্রতি তাঁর আগাধ শ্রদ্ধা রয়েছে। তাঁর গানের যে ব্যপ্তি, যে পরিধি এবং শুধু উপমহাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী সে যে জায়গা অর্জন করেছে, তা নিদারুণ গর্বের ব্যাপার। ঠাট্টাচ্ছলে নিজেকে একটু অলস, একটু ঢিমেতালের দাবী করে পোলাক বলেন, স্বপ্নীল সজীব থাকলে যেকোনো কাজে তিনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন। সজীব সমস্ত কাজ সহজেই সামলে নিয়ে পোলাককে নিস্তার দিতে পারেন।

এই দুই অত্যন্ত প্রতিভাবান শিল্পী শিল্পচর্চার পাশাপাশি নানা মানবতামূলক কাজেও নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। স্বপ্নীল সজীব “স্বপ্নীল ফাউন্ডেশন” নামে নিজস্ব একটি সংগঠনের মাধ্যমে পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত এবং বস্তির শিশুদের গান শেখানোর কাজ করেন। পিছিয়ে পড়া শিশুদের বাংলাদেশের সাথে, এদেশের সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে অত্যন্ত ছোট পরিসরে কাজ শুরু করে বর্তমানে এই সংগঠন প্রায় পাঁচ বছর ধরে এটি কাজ করে যাচ্ছে। এদেশের দীর্ঘ সময়ের সংস্কৃতির একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল এর অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থান। কিন্তু বর্তমানে সাম্প্রদায়িকতার একটি সুর নানা অপকর্মে এবং অপচেষ্টায় ফুটে উঠছে। পোলাক বলেন, সকল ধর্ম, বর্ণের মানুষের সহাবস্থান এদেশের সবসময়ের ঐতিহ্য। এখানে এত ভেদাভেদ কখনো ছিল না। বরং আমরা যদি দেশ, দশ এবং দলের ঊর্ধ্বে গিয়ে ভাবতে পারি তাহলে দেখবো আমরা সবাই এক বিশাল পৃথিবীর সমান অংশ। এই ঘটনাগুলো ধর্মীয় না যতটা, তার চেয়ে বেশি দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচার। সজীব যোগ করেন, মানুষের মাঝে এই একাত্মতার বোধ সৃষ্টি করার জন্যেই সংস্কৃতির চর্চা দরকার। সংস্কৃতির মাধ্যমেই মানুষের মাঝে উদারতা জন্ম নেয়, ভালোবাসা জন্ম নেয়। তাঁরা যখন বড় হয়েছেন, তখন এক সুস্থ সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছেন বলেই কখনো কোনো সংকীর্ণতা তাদের মাঝে জন্ম নেয়নি। বরং সকল ধর্মের মানুষের সাথে একাত্ম হয়ে সকল উৎসব উপভোগ করেছেন। এমনকি তাঁরা যে রবীন্দ্রনাথের কবিতা চর্চা করেন কিংবা যে সুর এবং রাগে সঙ্গীতচর্চা করেন, সবই তো তথাকথিত হিন্দুস্থানি সংস্কৃতির অংশ। শুধুমাত্র নিজেদের ঐতিহ্যগত মুক্তচিন্তা আছে বলেই তাঁরা এসব ধ্যান ধারনা ত্যাগ করে সকল আয়োজনে এবং উদযাপনে প্রাণ খুলে শরিক হতে পারেন। তিনি আরও বলেন, একটি নির্দিষ্ট চক্রই সকল দেশে এধরনের সাম্প্রদায়িক অপকর্ম ঘটিয়ে থাকে। আমাদের উচিৎ আধুনিক মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে মানুষকে এ ব্যাপারে সচেতন করে তোলা। এই দেশ আমাদের সবার রক্তের দামে অর্জন করা। তাই সব ভেদাভেদ দূর করেই দেশের জন্য কাজ করতে হবে। পোলাক বলেন, এ ধরনের সহনশীলতা শিক্ষা পরিবার থেকেই আসে। সব মানুষই এক সময় অন্ধকারে থাকে, তার উত্তরণের জন্য তাকে শিক্ষা দিতে হয়, জ্ঞান দিতে হয়, সংস্কৃতির সংস্পর্শে আনতে হয়। তখনই একজন মানুষের চিন্তার ক্ষুদ্রতা দূর করা সম্ভব।

শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞতা নিয়ে সজীব বলেন, সেখানকার শুধু শিক্ষক নয়, প্রকৃতিও শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে একজন বাংলাদেশী শিল্পী হিসেবে তাঁর জন্যে রবীন্দ্রচর্চার এই অভিজ্ঞতা খুবই গর্বের। কারণ রবীন্দ্রনাথকে আমাদের অর্জন করে নিতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে যেখানে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ ছিল, সেখানে আমারা স্বাধীনতার পাশাপাশি সাহিত্যচর্চার অধিকারকেও ছিনিয়ে এনেছি। এছাড়া তিনি আরও যোগ করেন, আমাদের দেশে হয়ত শান্তিনিকেতনের মতো প্রতিষ্ঠান নেই, কিন্তু তবুও আমরা নিজেদের জায়গা থেকে শুদ্ধভাবে রবীন্দ্রচর্চা করে যাচ্ছি। যেখানে পশ্চিমবঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সুর নিয়ে, গানের দৃশ্যায়ন নিয়ে এমন অনেক নিরীক্ষা হচ্ছে যা হয়ত রবীন্দ্রনাথের ভাবধারার সঙ্গে বেমানান। সেখানে আমরা এদেশে বেশ পরিশীলিতভাবে রবিন্দ্রচর্চার ধারাটি বজায় রাখছি। আর শান্তিনিকেতন এবং রবীন্দ্রভারতী সজীবের জন্য বরাবরই একটি তীর্থস্থানের মতো, যেখান থেকে তিনি অনেক কিছু শিখে আসতে পারেন, যেখানকার নির্যাসে অনুপ্রাণিত হতে পারেন। পোলাকও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথের নিজের হাতে তৈরি করা জায়গা। তাই এর মাহাত্ম্য অসীম এবং এর কার্যক্রম, আচরণ সবকিছুতেই বারবার রবীন্দ্রনাথ প্রতিফলিত হন। রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতিপ্রেমকে অনুসরণ করেই এখানে শ্রেণিকক্ষের বাইরের শিক্ষাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। কুষ্টিয়া কিংবা শাহজাদপুরের কুঠিবাড়িতে গেলেও এমনই প্রকৃতির সান্নিধ্য উপলব্ধি করা যায়। শান্তিনিকেতনে বসেই যেহেতু উনার প্রকৃতির অনেক নিখুঁত বর্ণনাগুলোর সৃষ্টি, সে জন্যেই রবীন্দ্রনাথকে চিনতে হলে, তাঁর প্রকৃতিপ্রেমকে উপলব্ধি করতে হলে তাঁর তৈরি করা সেই আশ্রমেই যেতে হবে। সজীব বলেন, ওখানকার সংস্কৃতি একটা মানুষকে কতটা সহজ পথে চলতে হবে এই শিক্ষাটা দেয়। সেজন্যেই সেখানকার শিক্ষা, ভালোবাসার জন্য তাঁরা আজীবন নিজেদের ভাগ্যবান মনে করবেন।

মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন নতুন স্বপ্ন দেখে, নতুন কিছু অর্জন করতে চায়। জীবনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জনের পরও আরো অনেক অধরা ইচ্ছা কাম্য রয়ে যায়। পোলাক জানান, তাঁর প্রপিতামহ অখন্ড ভারতে তাফসীলসহ সমগ্র কোরআন শরীফ অনুবাদ করেছিলেন। বর্তমানে এটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকেও প্রকাশিত হয়। তিনি তাঁর প্রপিতামহের এই কাজগুলোকে নিজের কন্ঠে কোনো মাধ্যমে প্রকাশ করতে চান। নিজেদের পূর্বপুরুষের উত্তরাধিকারকে এই কাজের মাধ্যমে তিনি সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান। আর এর বাইরে তাঁর আজীবনের স্বপ্ন হল সবসময় সুখী থাকা। অবসাদ, বিষাদের মতো সব নিরানন্দ অনুভূতিকে পাশে সরিয়ে সবসময় আনন্দে থাকাই তাঁর জীবনের লক্ষ্য। সজীব বলেন, তিনি স্বপ্ন দেখেন, তিনি একদল ভালো মানুষ তৈরি করবেন। তিনি যে শিশুদের নিয়ে কাজ করেন তাদেরকে তিনি আলোর পথ দেখাতে চান। তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্ন, এসব নিগৃহীত, অবহেলিত এসব শিশুদেরকে তিনি আলোকিত করতে চান। উপমহাদেশের বাইরে, বৃহত্তর বিশ্বের কাছে বাংলা গানকে পৌঁছে দেয়া তাঁর আরেকটি বড় স্বপ্ন। হলিউড বা এমন অনেক বড় মঞ্চে তিনি ভিন্ন ভাষাভাষীদের কাছে বাংলা গান তথা বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে চান। সেই লক্ষ্য নিয়েই তিনি নিজের মতো করে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এই বাংলা গান দিয়েই স্বপ্নীল সজীব স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান। বাংলা গানের ভেতর দিয়ে, বাংলা গানকে বিশ্ব দরবারে পৌঁছে দিয়ে তিনি মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে চান। সামিউল ইসলাম পোলাক বলেন, তিনি মানুষের ভালোবাসায় এবং নিজের বিশেষত্বে স্মরণীয় হতে চান। নিজের পরিশ্রম, প্রত্যয় এবং অধ্যবসায় দিয়ে নিজেকে তিনি অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চান এবং সেই কাজের মধ্য দিয়ে, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকতে চান। তাঁরা দুজনই নিজ নিজ ক্ষেত্রে ইতোমধ্যে নিজেদের অনন্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কথা অকপটে বলা চলে যে, তাদের হাত ধরেই তরুণ প্রজন্মের মধ্যে আমাদের ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি সঞ্চালিত হবে, শেকড়ের সাথে তরুণদের যোগাযোগ সুদৃঢ় হবে।

লিখেছেন – রোমান উদ্দিন

রিনি বিশ্বাস: দুই বাংলার প্রিয় মুখ

রিনি বিশ্বাস: দুই বাংলার প্রিয় মুখ

সতেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে পশ্চিম বাংলার টেলিভিশন জগতের এক অতি প্রিয় মুখ রিনি বিশ্বাস। বিনোদনের জগতে তার পদচারণা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় থেকে শুরু। রিনি বিশ্বাসের জন্ম ও বড় হওয়া সব কলাকাতা কেন্দ্রীক হলেও তার শেকড় কিন্তু এই বাংলাদেশেরই গোপালগঞ্জে গেঁথে আছে। নিজের অভিনয়, উপস্থাপনা, আবৃত্তি দিয়ে তিনি জি বাংলা, কালারস বাংলাসহ পশ্চিমবঙ্গের বহু জনপ্রিয় চ্যানেলের নিয়মিত মুখ। তার এই খ্যাতি পশ্চিমবঙ্গের সীমানা পেরিয়ে বাংলা ভাষাভাষী সকলের কাছে পৌঁছে গেছে। টেলিভিশনের বাইরেও লেখালেখির সাথেও আত্মিক যোগাযোগ রয়েছে তার। সে সূত্র ধরেই তিনি অসংখ্য ব্লগ, পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে প্রতিনিয়ত লিখে চলেছেন। তার ব্লগের মাধ্যমেই তিনি পাঠকদের কাছে নিজের পরিবার এবং মাতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ তুলে ধরেন। একজন শিল্পী হিসেবেও তিনি নিজের ব্র্যান্ড ‘আভরিনি’র মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করেছেন।

বর্তমানে মিডিয়ায় উপর বিভিন্ন কোর্স এবং ক্লাস নিয়ে থাকলেও নিজের পড়াশোনার বিষয় অর্থনীতিতেও রিনির ঈর্ষণীয় দক্ষতা রয়েছে। একসময় তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও তথা আকাশবাণীতে “অর্থনীতির দুনিয়া” নামক একটি অনুষ্ঠানও উপস্থাপনা করেছেন। সেখানে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদের সঙ্গে অর্থনীতির নানা জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং মানুষের বোধগম্য করে তা তুলে ধরেছেন। এছাড়াও দীর্ঘ উপস্থাপনা পেশায় মনোবিজ্ঞান, সাহিত্যের মতো আরও অনেক বিষয় নিয়ে তাকে আলোচনা করতে হয়েছে এবং সেখান থেকেই নিত্য নতুন নতুন বিষয় নিয়ে জ্ঞানার্জন করে গেছেন। তার বিভিন্ন ব্লগে সংসার, পরিবার এবং একই সাথে ক্যারিয়ার সামলানোর যে দ্বন্দ্ব, যে মানসিক টানাপোড়েন, তা অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে। তিনি জানান, তার সন্তান পাবলো জন্ম নেয়ার আঠারো মাস পরেই তার কর্মসূত্রে দেড় বছরের জন্য বুদাপেস্টে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু সেখানে যাওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যেই তিনি ফিরে আসেন। এমনকি যাওয়ার আগেও তার মন ছিল নানা দ্বিধাদ্বন্দ্বে জর্জরিত। তখনই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন একজন মেয়ে হিসেবে সবকিছু সামলানো কতটা কষ্টকর। হয়ত চারপাশের সবাই প্রয়োজনীয় সমর্থন দিচ্ছে, তবুও নিজের ভেতর থেকে আসা একটি টানাপোড়েন সবসময় এমন সিদ্ধান্তগুলোকে দ্বিধায় জড়িয়ে রাখে। 

নিজের মানবিকতা, আন্তরিকতা নিজের সন্তানের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে রিনি তাকে একজন ভালো এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে বড় করতে চান। সে জন্যেই তাকে এমন এক স্কুলে দিয়েছেন যেখানে ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদের কোনো অসুস্থ প্রতিযোগীতায় ঠেলে দেয়া হয় না। বরং যথাযথ মূল্যায়নের মাধ্যমে তাদের এগিয়ে যেতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ প্রদান করা হয়। তিনি নিজেও তার সন্তান এবং সন্তানের সমবয়সীদের এমন উপদেশ দেন, তারা যাতে জীবনের সকল অর্জনেও পা মাটিতে রাখে। পৃথিবীতে একা কেউ বাঁচতে পারে না, তাই তারা যাতে সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মতো মানসিকতা রাখে। অন্যের কাছ থেকে শুধুমাত্র নেওয়ার মানসিকতা না রেখে অন্যের জন্য কিছু করার চেষ্টাও যাতে তারা করে যায়। নিজস্ব জগৎ, পরিবার-পরিজনের গন্ডির বাইরে রিনি অত্যন্ত চাপা স্বভাবের। সে জন্যেই তিনি নিজের উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের ব্যাপারে বেশ সচেতন। উপস্থাপনা হোক কিংবা টক শো, তিনি জানান, কখনো কোথাও শুধু বলার খাতিরে কোনো কথা তিনি বলেন না। বরং নিজে যা অনুভব করেন, নিজের ভেতর থেকে যা বলার তাড়না বোধ করেন, সেটাই প্রাণ খুলে, নির্ভয়ে বলে যান। এছাড়া কথা বলার সময় নিজের উচ্চারণের ব্যাপারে তিনি বরাবরই বেশ সচেতন। বিশেষত কবিতা আবৃত্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত যত্ন নিয়ে এবং নিজের গুরুদের শিক্ষা মেনে কাজ করেন। এক্ষেত্রে তার দুজন শিক্ষক, শ্রীমতি রত্না মিত্র এবং প্রয়াত শ্রী প্রদীপ ঘোষের নাম স্মরণ করে তাদের অপরিসীম ভূমিকার কথা তিনি উল্লেখ করেন। এনারা সন্তানস্নেহে কবিতার এবং ভাষার প্রতি একটা ভালোবাসা তার মাঝে সৃষ্টি করেছেন। একই সাথে তার আজকের এই অবস্থানে আসার পেছনে রবীন্দ্রগীতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘দক্ষিণী’র অনবদ্য অবদানের কথাও তিনি বলেন। তার দৃঢ় বিশ্বাস, তার পরিবার, এসকল ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানই তাকে আজকের এই মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে।

রিনি বর্তমানের লেখকদের মধ্যে সাদাত হোসাইনের লেখা ব্যক্তিগতভাবে খুব পছন্দ করেন। তার কাছে মনে হয়, আমাদের ভাষায় যে কথাগুলো আমরা প্রকাশ করে উঠতে পারিনা, সাদাত হোসাইন তা খুব সুন্দর করে তার কলমে ফুটিয়ে তোলেন। এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনীও তাকে প্রচন্ড স্পর্শ করে। রিনি মনে করেন, চারপাশের নানা মন খারাপ করা পরিস্থিতিতেও তাদের লেখা অনেকটা আশার এবং স্বস্তির সঞ্চার করে। বর্তমানে বাড়তে থাকা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দিকে আঙুল তুলে বলেন, এখন মানুষের মাঝে সহিষ্ণুতার অনেক অভাব। যেকোনো সময় যেকোনো উড়ো খবরে কোনো চিন্তা বা বিচার ছাড়াই মানুষ হত্যা করতে উদ্দত হচ্ছে। অথচ এদের জীবননাশের যত চিন্তা, জীবনকে সুন্দর করার, মানুষকে বেঁচে থাকতে সাহায্য করার ব্যাপারে এত ভাবনা নেই। বরঞ্চ আমরা যেন এখন প্রতিবাদ না করা শিখে গেছি। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যদি এসব নিয়ে চিন্তা না করে, তাহলে আমাদের ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী। আমরা যদি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সংবেদনশীল করে তুলতে পারি, তাদেরকে জাত, ধর্ম, বর্ণের ঊর্ধ্বে মানুষ পরিচয়কে তুলে ধরতে পারি, তাহলে হয়ত তাঁরা এগুলো নিয়ে ভাববে।


দীর্ঘ কর্মজীবনের সুবাদে রিনির অসংখ্য কিংবদন্তীতুল্য মানুষের সঙ্গে মঞ্চ ভাগ করে নেয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন আশা ভোসলে, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্র, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, গুলজার, নাসিরুদ্দীন শাহ প্রমুখ প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ববর্গ। তিনি বলেন, আজও এই নামগুলো স্মরণ করলে তিনি রোমাঞ্চিত বোধ করেন, ভাবেন, আসলেও কি এই মানুষদের সঙ্গে একই মঞ্চে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন নাকি এ শুধু তার কোনো এক অলীক কল্পনা। রিনি স্মৃতিচারণ করেন একটি আলোচনা সভার কথা, যেখানে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নিজের পৈতৃক নিবাস, বাংলাদেশের গোপালগঞ্জের কথা বলতে গিয়ে তার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এছাড়া একটি অনুষ্ঠানে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় নিজে এগিয়ে এসে তার কাজের প্রশংসা করেন। এমনই স্নেহ তিনি নির্মলা মিশ্র, গুলজার প্রমুখের কাছেও পেয়েছেন। এই ঘটনাগুলো স্মরণ করে এখনো স্মৃতিকাতর হয়ে যান, তীব্র আবেগ তাকে ঘিরে ধরে। মা-বাবার স্বপ্ন ছিল তিনি একজন শিক্ষক হবেন, তিনি নিজেও সে পথেই এগোচ্ছিলেন। কিন্তু এখন মনে করেন, এই পেশায় না আসলে হয়ত এমন অনেক মূহুর্ত ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেত। এমনকি এই পেশার কল্যাণেই বহু পথ পাড়ি দিয়ে তিনি তার মায়ের আদিনিবাস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌঁছাতে পেরেছিলেন, নিজের শেকড়ে বসে অনুভব করেছিলেন এদেশের মানুষের একান্ত আতিথেয়তা।

রিনি নিজের কর্মজীবনের পাশাপাশি পরিবারের ক্ষেত্রেও ভীষণ সচেতন একজন মানুষ। তার সব কাজ, সব মানুষের ঊর্ধ্বে সর্বপ্রথম ভালোবাসার জায়গা দখল করে আছে তার ছেলে পাবলো। একজন মমতাময়ী মা হিসেবে পাবলোকে ঘিরেই তার কাজ, স্বপ্ন এবং জীবনের আবর্তন হয়। এর পরেই নিজের বাবা-মা এবং স্বামী পিনাকীর প্রতি তার তীব্র ভালোবাসা এবং ভরসা। তিনি বলেন, এই তিন মানুষের অনুপ্রেরণা এবং সমর্থনই তাকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যুগিয়ে যায়। সন্তানের যেকোনো ব্যাপারে নিজের বাইরে শুধু এই তিনজনকে ভরসা করেই তিনি নিশ্চিন্তে নিজের কাজ করে যেতে পারেন। সন্তানের প্রতি তার তীব্র ভালোবাসার ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাইতো নিজের মৃত্যুর পর নিজের সন্তানের মধ্য দিয়েই তিনি এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে চান। তিনি চান তিনি না থাকলেও তার ভাবনাগুলো, চিন্তাধারাগুলো যাতা তার সন্তান, পাবলোর মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকে এবং সেও যাতে এই ভাবনাগুলো তার পরবর্তী প্রজন্মে সঞ্চালিত করে। এর মধ্য দিয়েই তিনি তাদের মনে নিজের জায়গা করে নিতে চান। আমাদের আপামর বাঙালী সংস্কৃতির স্বার্থে, মানবিকতার স্বার্থে রিনি বিশ্বাসের মতো মানুষের আরও অনেকদিন আমাদের মাঝে কাজ করে যাক এমনই প্রত্যাশা আমাদের সবার।

লিখেছেন – রোমান উদ্দিন

মোহাম্মদ আশরাফুল: ব্যাটে যার সম্মোহনী শক্তি

মোহাম্মদ আশরাফুল: ব্যাটে যার সম্মোহনী শক্তি

বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক সুপরিচিত মুখ মোহাম্মদ আশরাফুল, যিনি ক্রিকেটের সব ফরম্যাটে অধিনায়কত্ব করার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রতিনিধিত্ব করেছেনদৃষ্টিনন্দন স্ট্রোক-প্লেতে অনুরাগী একজন টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যান আশরাফুল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০০১ সালে ১৭ বছর বয়সী হিসেবে অভিষেকের মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরি করা সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হন। ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে, আশরাফুল তেরোটি টেস্ট এবং আটত্রিশটি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে তার দেশের অধিনায়কত্ব করেছেন। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড তাকে ম্যাচ ফিক্সিংয়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর আট বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। নিষেধাজ্ঞাটি পরবর্তীতে ৫ বছরে নামিয়ে আনা হয়। নিষেধাজ্ঞা শেষে আশরাফুল ঘরোয়া ক্রিকেটে ফিরেছেন। ঢাকা প্রিমিয়ার লীগ এবং বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগের মতো টুর্নামেন্টগুলোতে নিয়মিত ব্যাট হাতে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।

মোহাম্মদ আশরাফুলের জন্ম হয়েছিল বাহেরচর, তাঁর নানাবাড়িতে। তাঁর গ্রামের বাড়ি বাঞ্ছারামপুর এবং তাঁর দাদুর বাড়ি মানিকপুর, যেখানে তাঁর বাবা পর পর দুইবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। মাত্র ৬ মাস বয়সে ঢাকায় খালার বাসায় চলে আসার পর এই শহরেই তাঁর বেড়ে ওঠা। খালাতো ভাই আফজাল আহমেদ পনিরের ক্রিকেট খেলা দেখতে দেখতেই ক্রিকেটের প্রতি আশরাফুলের ভালোবাসা জন্ম নেয়। খালাতো ভাইয়ের উৎসাহেই ১৯৯৬ এ এক অনূর্ধ্ব-১২ ক্রিকেট ক্যাম্পে তিন মাসের মতো প্রশিক্ষণ নেন। এই ক্যাম্পেই কোচ ওয়াহেদুল গণির নজরে আসেন তিনি এবং ওয়াহেদুল গণি ক্যাম্পের ৮০০ জনের মতো শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে আশরাফুলসহ ৫০-৬০ জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে “অঙ্কুর ক্রিকেটার্স” গঠন করেন। মূলত এখান থেকেই আশরাফুলের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্রিকেটার হওয়ার যাত্রা শুরু হয়। তার কিছুদিন পরেই তিনি ১৯৯৯ এ শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৩ বিশ্বকাপে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়ার নির্বাচিত হন। এরপর ২০০০ সালে মাত্র ১৪-১৫ বছর বয়সেই নিজের ব্যাটিংশৈলি দিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ দলের নির্বাচক রকিবুল হাসানের নজরে আসেন। অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পে বাংলাদেশ দলের তৎকালীন কোচ এডি বার্লো তাঁর খেলা দেখে সরাসরি মূল দলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করেন। সেখান থেকে খুব স্বল্প সময়ের পরিক্রমায় আশরাফুল বাংলাদেশ জাতীয় দলে নিজের জায়গা তৈরি করে নেন। আশরাফুল বলেন, খুব অল্প সময়ে এতদূর আসতে পারা তাঁর জন্য অনেক বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার। সাধারণত খেলোয়াড়দের জাতীয় দল পর্যন্ত আসতে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে হয়। 

আশরাফুল বলেন, এই পথ পরিক্রমায় তাঁর শিক্ষক ওয়াহেদুল গণির অবদান অসামান্য। ছোট থেকেই ওয়াহেদুল তাকে বয়সে বড় খেলোয়ারদের সাথে খেলাতেন, নিয়মিত ব্যাটিং অনুশীলনের সুযোগ দিতেন। তার ফলেই অসম সাহস এবং ভয়হীনতা জন্ম নিয়েছিল আশরাফুলের মাঝে। বাংলাদেশ টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পর ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম এওয়ে ট্যুর করে। সেখানেই সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে মাত্র ১৬ বছর বয়সে মোহাম্মদ আশরাফুলের ওডিআই অভিষেক হয়। দানবীয় গতিতে বল করা জিম্বাবুয়ের বলারদের সামনে কিছুতেই ভয় পাবেন না, এমন সংকল্প নিয়েই মাঠে নেমেছিলেন। তিনি জানান, মাত্র ৪ দিনের ব্যবধানে তাঁর জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তি অত্যন্ত সহজ হয়ে গিয়েছিল। প্রথমেই অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি বাংলাদেশে আসে, যাদের বিরুদ্ধে আশারফুল অপরাজিত ১১০ রান করেন। তার একদিন পরেই শুরু হওয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি ঢাকা মেট্রোর হয়ে ১৫৭ রান করেন এবং পরেরদিন ৭ উইকেট নেন। তাঁর মতে, চারদিনের মধ্যে এমন তিনটি বড় পারফরম্যান্সই তাকে জাতীয় দলে জায়গা করে দিয়েছে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে মোহাম্মদ আশরাফুলের শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকও সম্পন্ন হয়।

স্নায়ুবিক চাপ সামাল দিতে আশরাফুলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো খেলার প্রতি ভালোবাসা এবং খেলাকে বোঝার দক্ষতা। সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট শতকের রেকর্ডধারী এই ব্যাটসম্যান জানান, তিনি ছোটবেলা থেকেই খেলার সাথে জড়িয়ে থাকার কারণে সবসময় সাহসের সাথে মাঠে নামেন, যাতে হারলেও তাতে চেষ্টার ছাপ থাকে। এছাড়া খেলাধুলাকে ভীষণভাবে অনুসরণ করার কারণে সহজেই খেলার পরিস্থিতি তথা বোলারের মানসিকতা তিনি সহজেই বুঝে উঠতে পারেন। নিজের প্রথম টেস্টেই তাই অধিনায়ক নাইমুর রহমান দুর্জয় তাকে আগে ব্যাটিংয়ে পাঠান কারণ তিনি সহজেই মুত্তিয়া মুরালিধরনের বোলিং বুঝে উঠে তা মোকাবিলা করতে পারছিলেন। আশরাফুল বলেন, একাডেমিতে খেলা শেখার সময়টা থেকেই এই চিন্তাভাবনাগুলো তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছে। সে জন্যেই তিনি নিজে অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো গড়নের হলেও বিশালদেহী খেলোয়াড়দের মোকাবিলা করে সবসময় দলের জয়ে অবদান রাখতে পেরেছেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আশরাফুল তাঁর আশার কথা জনান। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের যে দলটি রয়েছে তার অবস্থান অনেক বেশি শক্ত। বিশেষ করে আমাদের অনেক তরুণ খেলোয়াড় রয়েছে যারা ভবিষ্যতে দলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে। তিনি ২০২০ সালে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, এই বিজয়ী দলের খেলোয়াড়রা চিন্তা-ভাবনা এবং আত্মবিশ্বাসে অনেক বেশি এগিয়ে রয়েছে। আগামী ৪-৫ বছরের মধ্যে যখন এই খেলোয়াররাই মূল দলে এসে দলের হাল ধরবে তখন তাদের কাছ থেকে আমরা অনেক ভালো কিছু ফলাফল পাবো। তিনি আরও জানান, নিজে এখন যেখানেই খেলেন সেখানে নিজের অভিজ্ঞতা, ভালো-খারাপের দিকগুলো তরুণ খেলোয়াড়দের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, একজন খেলোয়াড়কে প্রায় সময়ই অনেক কঠিন পরস্থিতির সম্মূখীন হতে হয়। সেসময় সবাই নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে দলকে সেই পরস্থিতি থেকে বের করে আনতে চেষ্টা করেন। সবসময় সফল না হলেও এই চেষ্টাটাই একজন খেলোয়াড়ের প্রধান পরিচায়ক। এছাড়া দেশের খেলার উন্নতিতে ঘরোয়া পর্যায়ের খেলাগুলোতে আরও গুরুত্ব দেয়ার কথাও আশরাফুল বলেন। তাঁর মতে, আমাদের বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লীগ বা বিপিএল যখন ২০১১-১২ সালে শুরু হয়েছিল তখন তা বিদেশী অনেক লীগের সমপর্যায়ের ক্রিকেট উপহার দিয়েছিল। কিন্তু তারপর থেকেই এর মান নীম্নমূখী। এছাড়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটেও প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই যেখানে আইপিএল এবং প্রথম শ্রেণি থেকে প্রতি বছর বিরাট সংখ্যক সম্ভাবনাময় খেলোয়ার জন্ম নিচ্ছে সেখানে আমাদেরও এই খেলাগুলোতে আরও মনোযোগ দেয়া উচিৎ। তিনি বলেন, আমাদের আরও খেলার চ্যানেল দরকার যেখানে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও প্রদর্শন করা হবে। এতে করে খেলোয়াড়দের স্পৃহা আরও বৃদ্ধি পাবে এবং এই লীগগুলো সার্বিকভাবে আরও কার্যকর হবে। একসময় ভারত-পাকিস্তান খেলা নিয়ে সমগ্র উপমহাদেশে এক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হতো। বর্তমানে নিজেদের খেলা দিয়ে বাংলাদেশও তেমনই প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টি করছে বলে আশরাফুল মন্তব্য করেন।

নিজের শুরুর দিককার সময়ের চ্যালেঞ্জিং বোলারদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে আশরাফুল বলেন, সেসময় প্রত্যেক দলের খেলোয়াড়দের নাম, তাদের বিশেষত্ব আশরাফুলদের মুখস্ত থাকতো। কীভাবে কার মোকাবিলা করা যায় এমন চিন্তা সার্বক্ষনিক সঙ্গী ছিল। সেসময় আশরাফুলের কাছে ছয় ফিট ছয় এর ইংলিশ বোলার এন্ড্রু ফ্লিনটফকে ভীষণ চ্যালেঞ্জিং মনে হত। টেস্ট সবচেয়ে পছন্দের ফরম্যাট হলেও আশরাফুল টি-টুয়েন্টিতেও নিজের প্রতিভার দেখিয়ে যাচ্ছেন। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে তাঁর পাকিস্তানের বিপক্ষে ৬৭ রানের সর্বোচ্চ ইনিংস রয়েছে, বিপিএলেও অপরাজিত ১০৩ রান করেছেন এক ম্যাচে। এছাড়া ঢাকা লীগ টি-টুয়েন্টিতে সোনারগাঁ ক্রিকেটার্স এর হয়ে মোহামেডানের বিপক্ষে তাঁর ৪১ বলে ১০৪ করার কৃতিত্বও রয়েছে। এমনকি তাঁর অনূর্ধ্ব-১২ তে ২০০ করার রেকর্ডও রয়েছে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই চেষ্টা করতেন যাতে বড় একটি রান করতে পারেন। তিনি ভাগ্যবান যে সেই অভ্যাস এখনো বর্তমান এবং সে জন্যেই সবসময় লম্বা ইনিংস খেলার চেষ্টা করেন।
নিজের ক্যারিয়ারের পেছনে পরিবারের অসীম অবদানের কথাও আশরাফুল ভালোবাসার সাথে স্বীকার করেন। তাঁর অনূর্ধ্ব-১৩ খেলার সময় থেকেই পরিবার তাঁর পেছনে থেকে স্বপ্নপূরণের প্রেরণা দিয়ে গেছে। নিজের লক্ষ্য থেকে যাতে চ্যুত না হন তাই কখনো তাকে কোনো চাপ তাকে দেয়া হয়নি বলে তিনি জানান। বলেন, এক অসাধারণ পরিবার পাশে পেয়েছেন বলেই পথচলা অনেকটা সহজ হয়ে গিয়েছে। নিজেদের যৌথ পরিবারে নিজেকে আশরাফুল একপ্রকার মেহমানই দাবি করেন। কারণ নিজের খেলার বাইরে আর কিছুতেই তাকে মনোযোগ দিতে হয় না, আগে তাঁর বাবা সব সামলাতেন আর এখন বড় ভাই একা হাতে সব দায়িত্ব পালন করে যান। এভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে খেলায় মন দেয়ার সুযোগ করে দেয়ার জন্য পরিবারের প্রতি তাঁর অশেষ কৃতজ্ঞতা। বিদেশে খেলতে গেলে সবসময়ই চেষ্টা করেন স্ত্রী-সন্তানদের নিজের সাথে নিয়ে যেতে। খেলার সাথেই আশরাফুলের জীবনের অনেক মজার অভিজ্ঞতা, অনেক স্মৃতি জড়িত। এর পাশাপাশি গানের সাথেও কিন্তু তাঁর দারুন সখ্যতা। অস্ট্রেলিয়ান কোচ জেমি সিডন্স এর অধীনে খেলার সময় যখন অস্ট্রেলিয়া দল সফরে আসে তখন অধিনায়ক আশরাফুলের ঘাড়েই দলের জন্য একটি থিম সং নির্বাচনের দায়িত্ব পড়েসেই সময় আশরাফুলের হাত ধরেই বাংলাদেশ দল জিতলে ‘আমরা করব জয়’ গানটি গাওয়ার চল শুরু হয় যেই প্রথাটি এখনো চলমান।

আশরাফুল বলেন, আমাদের ক্রিকেটের উন্নতির জন্য সবচেয়ে বেশি যা দরকার তা হলো সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি। বর্তমানে আমাদের যত পরিশ্রমী এবং দক্ষ খেলোয়াড়রা রয়েছে তারা নিজ চেষ্টায় ভালো করে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের উচিৎ তাদের অনুশীলনের সুযোগ-সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা। ইনডোর অনুশীলনের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করতে হবে যাতে করে বিরূপ আবহাওয়াতেও অনুশীলন চলতে পারে। এছাড়া তিনি মনে করেন, আমাদের আরও বেশি বেশি খেলার আয়োজন করতে হবে। এতে করে খেলোয়াড়দের ভালো খেলার বা নিজেদের ভুল শুধরে নেয়ার একটা নিয়মিত অভ্যাস তৈরি হবেআশরাফুল স্বপ্ন দেখেন একদিন বাংলাদেশ টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টুয়েন্টিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করবে। সে জন্যেই খেলোয়াড়দের খেলার নিয়মিত একটি পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ দরকার। আশরাফুল চান সবসময় তাকে যেন সবাই একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখে। সে জন্য নিজের কাজকর্মে, চলাফেরায় সবসময় ভদ্রতা এবং মানবিকতা বজায় রাখেন। বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই উজ্জ্বল তারকা ভবিষ্যতেও দেশের জন্য আরও অনেক গৌরব বয়ে আনবেন, এমনই প্রত্যাশা রইল।

কানিজ আলমাস ও এমদাদ হক: দেশীয় ফ্যাশন ও সৌন্দর্যের নবসংজ্ঞায়ন

কানিজ আলমাস ও এমদাদ হক: দেশীয় ফ্যাশন ও সৌন্দর্যের নবসংজ্ঞায়ন

কানিজ আলমাস খান বাংলাদেশের সৌন্দর্য সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান পারসোনা হেয়ার অ্যান্ড বিউটি লিমিটেড-এর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক। একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি সুপরিচিত। ১৯৯১, ১৯৯৬, ১৯৯৮ সালে ইউনিলিভার বাংলাদেশের ব্র্যান্ড সানসিল্ক এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিজনেস অ্যাওয়ার্ডস ২০০৯ এবং একই বছর ভারতে ওয়ার্ল্ড লিডারশিপ কংগ্রেস থেকে ওয়ার্ল্ড ব্র্যান্ড লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কার জিতেছেন। তিনি ঢাকার ইডেন কলেজ থেকে ব্যাচেলর সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও তিনি কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লি, পাকিস্তান, ব্যাংকক এবং চীন থেকে পেশাদারী প্রশিক্ষণ কোর্স সম্পন্ন করেন। কানিজ আলমাস খান প্রথমে ঢাকার কলাবাগানে গ্ল্যামার নামে একটি সৌন্দর্য সেবাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। পরে গ্রাহকসংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রূপবিশেষজ্ঞ ফারজানা শাকিলের সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করেন পারসোনা। বর্তমানে সারা বাংলাদেশে পারসোনার ১১টি শাখা রয়েছে।

বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির আরেক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব এমদাদ হক ১৯৬৮ সালে পুরান ঢাকার উর্দু রোডে জন্মগ্রহণ করেন। এমদাদ হক শুধু বাংলাদেশের ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির উত্থানের একজন সাক্ষী ছিলেন না, তিনি ছিলেন এর সক্রিয় কর্মী। এই শিল্পের সাথে ১৯৮৫ সাল থেকে তার সম্পৃক্ততা। তিনি অধুনালুপ্ত ‘বিচিত্রা’ পত্রিকার সাথে যুক্ত ছিলেন ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি প্রচলিত চাকরি বেছে না নিয়ে ব্র্যাকের রেশম চাষ প্রকল্পে যোগ দেন। পরে তিনি প্রধান পণ্য উন্নয়ন কর্মকর্তা হিসেবে ‘গ্রামীণ উদ্যোগ’-এ চলে যান। পণ্যের বিকাশ ও নকশা ছাড়াও, এমদাদ হকের বাজারের পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য একটি অসাধারণ দূরদর্শিতা ছিল। গ্রামীণ শিল্পকে একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি তা ছেড়ে দেন। এরপর তিনি তার কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে ‘বাংলার মেলা’ প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই কোম্পানির একজন উল্লেখযোগ্য পরিচালক এবং ডিজাইনার ছিলেন। তৎকালীন বাংলার মেলার ঈর্ষণীয় সাফল্যে তার বিশেষ অবদান ছিল। বাংলার মেলায় ডিজাইনারের পদ ছেড়ে তিনি পরে নিজের কোম্পানি স্টুডিও এমদাদ চালু করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিনি বাংলাদেশের ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিলের সহ-সভাপতি ছিলেন। গুণী এই ব্যক্তিত্ব ২০২২ সালের ২৩ ডিসেম্বর, ৫৭ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে যান। তবে কিছু মানুষের দৈহিক মৃত্যু মানেই বিস্মৃতি নয়, এমদাদ হক তেমনই একজন। আজীবন তিনি আমাদের মাঝে বরণীয় হয়ে থাকবেন দেশের স্থানীয় ফ্যাশন শিল্পে তার রেখে যাওয়া বিশাল পদচিহ্ন এবং সুবৃহৎ শূন্যস্থান দিয়ে। 

সৌন্দর্য নিয়ে অনন্য ভাবনা ছিল এমদাদ হকের। তার মতে, ফ্যাশন ও সৌন্দর্য আলাদা কিছু নয়, বরং একটি সার্বিক জীবনযাত্রার অংশ। প্রত্যেক মানুষই তার চালচলন, পোশাক এবং উপস্থাপনায় সৌন্দর্যের ছোঁয়া রাখতে চায়। সে জন্য মানুষের জীবন, জীবনের সংজ্ঞা এবং জীবনের সুরের সাথে ফ্যাশন এবং সৌন্দর্য দুটোই নিবিড়ভাবে জড়িত। এ ব্যাপারে কানিজ আলমাস আরও যোগ করেন, মানুষের অন্তরের সৌন্দর্য হল তার আসল সৌন্দর্য। বাহ্যিক সব কিছুই এই ভেতরকার রূপের সাথে যুক্ত হয়ে একটি চিত্র তুলে ধরে মাত্র। কারও মনে কদর্য থাকলে তা অবশ্যই তার চেহারায় প্রকাশিত হয়। তিনি বলেন, ফ্যাশনের এই পেশায় থাকার জন্য কাজকে ভালোবাসা ও সম্মান করা অত্যন্ত জরুরি।

এমদাদ হক জানিয়েছিলেন, ফ্যাশন জগতে তার শুরুর পদচারণা যেমন সহজ ছিল, তেমনি কঠিনও ছিল। যখন তিনি সবে মাত্র ঢাকা কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন বাবাকে হারিয়ে অনেকটা দিশেহারা হয়ে যান। এই সময়ই পারিবারিক বন্ধু শামীম আজাদের হাত ধরে ‘বিচিত্রা’র প্রাঙ্গণে আনাগোনা শুরু হয়। ‘বিচিত্রা’র মধ্য দিয়েই তিনি এক ভিন্ন জগতের খোঁজ পান, তার সামনে উন্মুক্ত হয় এক নতুন রকমের শৈল্পিক জগৎ। দীর্ঘদিনের সহকর্মী এবং বন্ধু কানিজ আলমাস সম্পর্কে তিনি বলেন, কানিজ আলমাস নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। শুধু বাহ্যিক প্রশাধনী নয়, কানিজ আলমাস কাজ করেন অন্যকে তার নিজস্ব সৌন্দর্য উপলব্ধি করাতে। তার মানুষকে কাছে টেনে নেয়ার, মানুষকে নিয়ে কাজ করার এই গুণের ভূয়সি প্রশংসা করেন এমদাদ হক। 

কানিজ আলমাস বলেন, এ দেশে যখন হাতে গোনা দুই-একটা বিউটি স্যালুন তখন থেকেই তার এই কাজের প্রতি ভালোলাগা তৈরি হয়। তবে নতুন ধরনের পেশা হিসেবে শুরুতে অনেক মানুষেরই কটু কথার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাকে এবং তার সহকর্মীদেরকে। সেসব পেরিয়ে এই পেশা এখন অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, নিজে যখন স্নাতকোত্তর করছিলেন, তখনই তার এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের ইচ্ছা জাগে। তখন নিজের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকেও প্রয়োজনীয় আর্থিক এবং মানসিক সহায়তা পেয়েছিলেন বলেই নিজের ভালোলাগার কাজটি শুরু করতে পেরেছিলেন। 

এমদাদ হকের কাছে আমরা দেশীয় বস্ত্রশিল্পের অগ্রগতির কথা শুনতে পেয়েছিলাম। তিনি বলেন, জামদানীর মত কাপড় নিয়ে দীর্ঘসময় ধরে গবেষণা চলছে। তার মাধ্যমেই উঠে আসছে আদি জামদানীর প্রকৃত রূপ। দেশীয় তাঁতীদের নিয়ে এসব গবেষণার উপর ভিত্তি করেই আরও সূক্ষ্ম এবং খাঁটি জামদানী তৈরি হচ্ছে। তবে এর ফলে সাধারনভাবেই এমন শাড়ির দাম বেড়ে যাচ্ছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে শাড়ি একটি শৌখিন, আনুষ্ঠানিক পোশাক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে সবাই চায় জামদানীর মত শাড়ি নিজেদের সংগ্রহে রাখতে। এর মাধ্যমেই আমাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা দাঁড়িয়ে থাকবে। এই কথার সাথে কানিজ আলমাসও সুর মিলিয়ে বলেন, বর্তমানে নারীদের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে শতগুণ। এ কারণেই তারা দৈনন্দিন জীবনে দ্রুত পড়া যায় এবং সহজেই সামলানো যায় এমন পোশাক বেশি পড়েন। তবে যেকোনো অনুষ্ঠানে এখনও শাড়ি পছন্দের তালিকায় প্রথমের দিকেই থাকে বলে তিনি জানান। নারীদের বেশিরভাগই বিয়ে বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে কাতান, জামদানী ইত্যাদি শাড়িই পড়তে আগ্রহী। এ ব্যাপারে এমদাদ হক যোগ করেন, এই পোশাক নির্বাচনের ক্ষেত্রে মিশ্র সংস্কৃতিরও একটি প্রত্যক্ষ ভূমিকা আছে। অনেকেই এখন বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে বিদেশি সংস্কৃতির সাথে মিল রেখে বিয়ের পোশাক তৈরি করতে চান। কিন্তু এ ব্যাপারে এমদাদ হক ছিলেন নিজের সিদ্ধান্তে অটল, সবসময়ই দেশীয় পোশাকের প্রতিই জোর দিয়ে গেছেন। জীবনের শেষদিকে বিয়ে, জাতীয় উৎসবসহ নানা অনুষ্ঠান নিয়ে নিজের মতো করে কাজ করছিলেন তিনি। নিজের পোশাকগুলোতে সবসময় রাখতেন প্রাকৃতিক রঙ এবং ডিজাইনের ছাপ। কানিজ আলমাসও বলেন, তিনি নিজের পণ্যগুলোতে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারের চিন্তা ভাবনা করছেন। এতে করে তার ক্রেতারা ভবিষ্যতে অনেক উপকৃত হবেন। অনেক আগে থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছেন, সৌন্দর্যের মূল উপাদান হল স্বাস্থ্য। সেজন্যেই তার প্রতিষ্ঠান ‘পারসোনা’কে শুধু সৌন্দর্যবর্ধক সেবা কিংবা পণ্যতে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি আরও যোগ করেছেন জিম, স্পা, যোগব্যায়াম-সহ আরও অনেক সেবা। ২০০৭ থেকে তার নিজস্ব একাডেমির কাজ শুরু হয়েছে যেখানে আগ্রহী তরুণীরা এই পেশা এবং সেবা সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ট্রেনিং গ্রহন করতে পারে। এর বাইরে ‘পারসোনা’র পুরুষদের জন্যও আলাদা অংশ রয়েছে যাতে করে তারাও সেবা গ্রহন করতে পারে। তার এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি নিয়মিত নারীদের ক্ষমতায়নের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এসিড আক্রান্ত নারীদেরকে যথাযথ ট্রেনিং দিয়েছেন যার ফলে তারা সাহস এবং পেশাদারিত্বের সাথে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করে যাচ্ছে।

এমদাদ হকের একটি স্বপ্ন ছিল দেশের ও বিদেশের দোকানগুলোতে বিভিন্ন নামীদামী ব্র্যান্ডের মতো বাংলাদেশের বিভিন্ন ডিজাইনারের পোশাকের আলাদা একটি অংশ থাকবে। এখন বিদেশের অনেক জায়গাতেই “মেইড ইন বাংলাদেশ” লেখা কাপড় দেখা যায়। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের বিভিন্ন ডিজাইনারের যে নিজস্বতা রয়েছে, তাদের নিজেদের চিন্তায় তৈরি যে পোশাকগুলো রয়েছে, তা সত্ত্বেও তাদের পরিচিতি এখনও সীমিত। তিনি আশা করেছিলেন, বাংলাদেশের এই ডিজাইনাররা একদিন নিজের নামের মাধ্যমেই বিশ্বের কাছে দেশকে উপস্থাপন করবেন। তিনি ‘মেধা’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ করছিলেন। এর বাইরে তিনি তৈরি করতে চেয়েছিলেন একটি বৃদ্ধালয় বা অবসরগৃহ, যেখানে মানুষ নিজের একাকিত্বে প্রকৃতির সান্নিধ্য খুঁজে পাবে। মানুষ চাইলেই নির্মল প্রকৃতির মাঝে কিছুদিনের জন্য হারিয়ে যেতে পারবে। এই ‘মেধালয়’-এর মধ্য দিয়েই তিনি মৃত্যুর পর বেঁচে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তার নাম প্রতিষ্ঠানে থাকতে হবে না, বরং প্রতিষ্ঠানটিই তার মৃত্যুর পর তার পরিচায়ক হয়ে উঠবে। আজ যখন তিনি নেই, তখন তার কাজ, তার প্রতিষ্ঠান যেমন তার পরিচায়ক হয়ে উঠেছে, তেমনি তার শূন্যতাও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

কানিজ আলমাস তিনি চান, তার মৃত্যুর পর পরবর্তী প্রজন্ম যাতে প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যায়। তিনি জানালেন, তার মেয়ে প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অংশের সাথে, বিশেষ করে মাসিক ম্যাগাজিন ‘ক্যানভাস’ এর সাথে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে এবং কাজ করে যাচ্ছে। তার ইচ্ছা, এই যে নতুন প্রজন্ম আসছে, তিনি দেখতে না পারলেও তারা এই প্রতিষ্ঠানে সম্মানের সাথে কাজ করতে পারবে এবং এটিকে স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল রাখবে। বাংলাদেশের ফ্যাশন এবং সৌন্দর্য জগতের দুই কর্ণধার এমদাদ হক এবং কানিজ আলমাস। আশা রাখি, এমদাদ হক ওপারে বসে তার এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সাফল্যে একটু হলেও আনন্দিত এবং কানিজ আলমাস আরও দীর্ঘদিন এদেশের মানুষের জন্য সৌন্দর্যের নতুন সংজ্ঞায়ন করে যাবেন।

লিখেছেন – রোমান উদ্দিন

ডা. মুহিউদ্দীন আহমেদ: মানবসেবায় নিয়োজিত একজন নিবেদিত প্রাণ

ডা. মুহিউদ্দীন আহমেদ: মানবসেবায় নিয়োজিত একজন নিবেদিত প্রাণ

ডা. মুহিউদ্দীন আহমেদ মিড-আটলান্টিক কায়জার পার্মানেন্ট মেডিকেল গ্রুপের ফিজিশিয়ান এবং অ্যাসিস্টেন্ট সার্ভিস চীফ। তিনি অ্যাশবার্ন, ভার্জিনিয়ার একজন অভ্যন্তরীণ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৮০ সালে মেডিকেল স্কুলে যোগদান করেন এবং স্নাতক সম্পন্ন করেন। এছাড়াও তিনি ১৯৯১ সালে প্রখ্যাত সেন্ট হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্বাস্থ্য বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। চিকিৎসার বিভিন্ন বিষয়ে, বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ মেডিসিনে তার ৪৩ বছরেরও বেশি অভিজ্ঞতা রয়েছে। ডাঃ মুহিউদ্দীন আহমেদ মিড-আটলান্টিক স্টেটস ইনকর্পোরেটেডের কায়জার ফাউন্ডেশন হেলথ প্ল্যানসহ মেডিকেল গ্রুপের অন্যান্য ডাক্তার এবং চিকিত্সকদের সাথে নানা কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছেন। করোনা চলাকালীন সময়ের সাক্ষাৎকারে আমাদেরকে সময় দিয়েছিলেন ডা. মুহিউদ্দীন আহমেদ।

ওমিক্রন ও করোনার অন্যান্য রূপভেদ নিয়ে তিনি জানান, প্রাকৃতিক নিয়মেই প্রত্যেক প্রজাতি টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন আনুসারে পরিবর্তিত হয়। যখনই কোনো প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির সম্মূখীন হয় সেই প্রাণী নিজেকে পরিবর্তন করে নতুন পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে। এখানেও ঠিক তাই হয়েছে। 

করোনার ভয়াবহতা নিয়ে তিনি বলেন, তার নিজের কর্মক্ষেত্রে মহামারীর শুরুতে দৈনিক দেড়শ থেকে দু’শ বা সর্বোচ্চ তিনশ রোগী আক্রান্ত হিসেবে সনাক্ত হত সেখানে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল দুই থেকে তিন হাজারে। তিনি জানিয়েছিলেন, তখন দুটি বা তিনটি ভ্যাক্সিন নেয়া অনেকেই দ্বিতীয়বারের মতো সংক্রমিত হয়েছিল কিন্তু যারা ভ্যাক্সিন নিয়েছিল এমন রোগীদেরকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। এই সংক্রমণের পেছনে আরেকটি কারণ হিসেবে তিনি দায়ী করেছিলেন মানুষের অসচেতনতাকে।

একজন চিকিৎসক হিসেবে তিনি মনে করেন, সুযোগ থাকলে সবারই বুস্টারসহ প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক টিকা গ্রহণ করা উচিৎ। পূর্ববর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, প্রতিষেধক গ্রহনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা শূন্য না হলেও আক্রান্তের মাত্রা অনেকখানি কমে যায়। তিনি বলেন, প্রতিষেধক গ্রহণের পরও যদি কেউ আক্রান্ত হয় তবে সে কিছুটা ভুগলেও তার প্রাণনাশের সম্ভাবনা থাকে না। এক্ষেত্রে বুস্টার নেয়ার সময়সীমার মধ্যে যদি কেউ আক্রান্ত হন তবে অন্তত দশদিন অপেক্ষা করে তবেই বুস্টার ডোজ নেয়া উচিৎ। 

কোভিড-১৯ এর বিভিন্ন ভ্যারিয়েন্ট সংক্রান্ত বিভ্রান্তি নিয়ে তিনি বেশ পরিষ্কার ধারণা উপস্থাপন করেন। কোভিড-১৯ সনাক্তকরণে যে পিসিআর পরীক্ষাটি করা হয় সেখানে একইসাথে কোভিডের সকল ভ্যারিয়েন্টের জন্য পরীক্ষা করা হয় বলে তিনি জানান। এবং কোনো একটি ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তও হলেই রোগীকে কোভিড আক্রান্ত হিসেবে সনাক্ত করা হয়। এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত তা জানা অপ্রয়োজনীয় এবং অর্থহীন। কারণ আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসাপদ্ধতি কিংবা বিধিনিষেধ ভ্যারিয়েন্ট অনুসারে পরিবর্তিত হয় না। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু ল্যাবই শুধুমাত্র নির্দিষ্ট করে ভ্যারিয়েন্ট নির্ণয়ের কাজ করে। কাজেই রোগী কোন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত তা বলা খুবই শক্ত।

একজন চিকিৎসকের হাতে যখন রোগীর বাঁচা-মরা খুব জটিলভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তখন অনেকসময়ই কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসে না। এমন অপ্রিয় মূহুর্তে রোগীর স্বজনদের পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করা এবং সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে বলার মতো কঠিন কাজও করতে হয়। তিনি বলেন, অনেক সময়ই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনোভাবে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে একটি সম্মানজনক মৃত্যুই অধিকতর মানবিক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়ায়। এক্ষেত্রে রোগীর স্বজনদের সাথে কর্তব্যরত চিকিৎসক এবং অন্যান্য কর্তা-ব্যক্তিরা কথা বলে একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসতে হয়। সেদিক দিয়ে তার কর্মক্ষেত্রে আমেরিকাতে খুব কম সমস্যার সম্মূখীন হতে হয় বলে তিনি জানান। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগীর স্বজনরা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে একটি বাস্তবিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। বিজ্ঞানের এই আধুনিক যুগেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের কিছু বেদনাদায়ক সীমা অবশ্যই আছে। তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ডা. মুহিউদ্দীন সবাইকে ধৈর্য্যধারণ করার পরামর্শ দেন। ইসলাম ধর্মের দৃষ্টিকোণ থেকে যারা মহামারীতে মারা যায় কিংবা আক্রান্ত এলাকায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে, তারা শহীদের মর্যাদা পায়। তাই এধরণের অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতে তিনি নিজেও ধৈর্য্যের সাথে কাজ করেন এবং অন্যদেরও ধৈর্য্যধারণ করতে বলেন।

তিনি একজন চিকিৎসক হিসেবে সবসময়ই নিজের আত্মাকে, নিজের বিবেককে পরিশুদ্ধ রাখতে চান। সবসময় চিন্তা করেন, যে আচরণ নিজের জন্য ও আপন কারও জন্য প্রত্যাশা করেন না, তা যেন তিনিও অন্য কারও সাথে না করেন। আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ হল বিশ্বাস। নিজের বিবেকের প্রতি ও মতবাদের প্রতি বিশ্বাস না থাকলে কখনোই পরিশুদ্ধ হওয়া যায় না। সঠিক এবং ভুলের সাধারণ ধারণা সৃষ্টিকর্তা সবার মাঝেই দিয়েছেন। যা আমরা নিজের জন্য প্রার্থনা করিনা মানুষের সাথে এমন কিছুই না করা, এই চিন্তার মধ্য দিয়েই সমাজের অনেক অনাচার দূর করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। 

সবশেষে, ডা. মুহিউদ্দীন আহমেদ এই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে, মৃত্যুর পর কেউ যেন তাকে নেতিবাচকভাবে মনে না রাখেন। মানুষ হিসেবে আমরা প্রত্যেকেই কখনও না কখনও ভুল করি, কাউকে কষ্ট দেই, তিনি চান, তার এই ঘটনাগুলো মাফ করে দিয়ে সবাই যাতে শুধুই তাকে ভালোবাসার সাথে স্মরণ করেন। তার জন্যে প্রত্যাশা রইল, তিনি যেন তার এই সাধারণ অথচ অনন্য চিন্তাধারা নিয়ে আরও বহুবছর মানবসেবায় কাজ করে যেতে পারেন।

লিখেছেন – রোমান উদ্দিন

জীবনের কথক: ফরহাদ হোসেন

জীবনের কথক: ফরহাদ হোসেন

দেশ ও দেশমাতৃকার সাথে প্রতিটি মানুষের আত্মিক সম্পর্ক থাকে। অনেকে নিজের দেশ কে ছেড়ে যেতে পারলেও দেশের মায়াকে ছাড়তে পারেন না। তাইতো প্রবাস জীবনেও হন্য হয়ে দেশ ও সংস্কৃতির জন্য অকাতরে কাজ করে যান অনেকেই। নানা বৈরী পরিবেশ ও সংস্কৃতির ভিড়ে নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরার চেষ্টা করে যান অনেকেই। আজকে ঠিক এমনই একজন ব্যক্তিত্বের কথা বলব; দেশীয় সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে যার অবাধ পদাচারণা – ফরহাদ হোসেন। তিনি একাধারে একজন লেখক, চিত্রনাট্যকার, নির্মাতা, প্রযোজক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।

ফরহাদ হোসেন সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের ব্যক্তিত্ব হলেও পেশাগত জীবনে তিনি একজন আইটি কনসালটেন্ট। শিকাগোর ডিপলস ইউনিভার্সিটি থেকে তিনি কম্পিউটার ম্যানেজমেন্ট এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস এ স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। বর্তমানে তিনি বিশ্ববিখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএম এ আইটি কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। এছাড়াও তিনি শিকাগো ফিল্ম মেকারস থেকে চলচিত্র নির্মাণ ও পরিচালনায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে “শিকাগো বায়োস্কোপ” নামে নিজস্ব প্রোডাকশন হাউস প্রতিষ্ঠা করেন। 

চিত্রনাট্য থেকেই মূলত ফরহাদ হোসেন লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেছেন। লেখালেখির অনুপ্রেরণার উৎস কোথায় এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শুরুতে তিনি চিত্রনাট্য লিখতেন, তারপর নিজে কাজ করেছেন নিজের চিত্রনাট্যে, পরিচালনা করেছেন, কিন্তু কখনও লেখক হবেন সেই কথা তিনি চিন্তা করেন নি। তার লেখালেখির প্রথম অনুপ্রেরণা হলেন জনপ্রিয় অভিনেতা শহিদুজ্জামান সেলিম। শহিদুজ্জামান সেলিম একবার আমেরিকায় যান শ্যুটিং এর কাজে। তখন তিনি ফরহাদ হোসেনের সাথে পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী সাক্ষাৎ করেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে ফরহাদ হোসেন শহিদুজ্জামান সেলিমকে একটি চিত্রনাট্য পড়তে দেন এবং এটা জানান যে ফরহাদ হোসেন চান তিনি যাতে সেই চিত্রনাট্যে অভিনয় করেন। কিন্তু ফরহাদ হোসেনের লেখা চিত্রনাট্য এতটাই চমকপ্রদ এবং উচ্চমানের হয়েছে যে শহিদুজ্জামান সেলিম ফরহাদ হোসেনের স্ত্রীকে বলে আসেন যেন তিনি তার স্বামীকে লেখার জন্য অনুপ্রেরণা দেন। তিনি জানান, পরবর্তী অনুপ্রেরণা হলেন ফরিদা পারভীন এবং তৃতীয় অনুপ্রেরণা হলেন অন্যপ্রকাশের মাজহার ইসলাম। মাজহার ইসলাম যখন তাকে ডেকে বলেন যে অন্যপ্রকাশ তার লেখা ছাপাতে চায়, তখন তিনি সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। এটাই মূলত তার চিত্রনাট্যকার থেকে গল্পকার হয়ে ওঠার ছোট গল্প। “তৃতীয় পক্ষ” নামক বইটি তার প্রথম প্রকাশিত বই। এরপর এক দশকে মোটামুটি ৫/৬ টি গ্রন্থ রচনা করে ফেলেছেন তিনি। 

চরিত্রগুলো মূলত কোথা থেকে সৃষ্টি এবং এর সাথে বাস্তবিক জীবনের কোন যোগসূত্র আছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চরিত্র সবসময় কাল্পনিক নয়। লেখার সময় ও ভাবনার সময় নিজের জীবনের প্রতিফলন চরিত্রগুলোতে প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ ভাবে চলে আসে। লেখকেরা নিজের জীবনের ঘটনাও অনেক সময় বেনামে লিখে ফেলেন।

তিনি জানান, প্রবাস জীবনে নানাবিধ সমস্যায় জর্জরিত থাকে মানুষ। সংস্কৃতির ভিন্নতা, ব্যক্তিগত সমস্যা, পারিবারিক সমস্যা, হতাশা, সিটিজেনশিপ নিয়ে চিন্তা এসব প্রতিটি অভিবাসী বাঙালির জীবনের চিত্র। আর এই বিষয়গুলিই তিনি তার লেখনিতে ফুটিয়ে তুলেন।

জীবন একাধারে যেমন সহজ একটি বিষয় ঠিক তেমনি জীবন অনেক জটিলও। জীবনের এই সহজ ও জটিল সমীকরণের নাম সম্পর্ক। মানুষের জীবনের সমীকরন লেখক ফরহার হোসেনের কাছে কেমন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব সম্পর্কই যত্নের ফসল। সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছুর পরিবর্তন হয়,  সম্পর্কে আসে নতুন মোড়। তাই তার কাছে সম্পর্কের আরেক নাম যত্ন।

লেখকের প্রিয় লেখক কে? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বেশ কয়েকজন গুনী লেখকের নাম বলেন। প্রথমত, হুমায়ুন আহমেদ তার প্রিয় লেখক। বুদ্ধদেব গুহ দিয়ে তিনি নিজেকে পাঠক হিসেবে উপস্থাপন করলেও হুমায়ুন আহমেদ দিয়ে তিনি প্রভাবিত বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হুমায়ুন আহমেদ তাকে কেবল পাঠক নয় একজন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতেও প্রভাবিত করেছেন। তারপর বুদ্ধদেব গুহ ও সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার প্রিয় লেখক। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সাথে তার সাক্ষাৎ হলেও বুদ্ধদেব গুহের সাথে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য তার হয়নি। তবে টেলিফোনে তাদের শুভেচ্ছা বিনিমিয় হয়েছে বলে জানান তিনি। এমনকি বুদ্ধদেব গুহ তাকে ও তার স্ত্রীকে উপহারও পাঠিয়েছেন। এই তিনজন ছাড়াও শমরেশ মজুমদার তার প্রিয় লেখক। 

নতুন প্রজন্মের লেখকদের মাঝে কার লেখা সবচেয়ে ভালো লাগে ফরহাদ হোসেনের এর উত্তরে তিনি বলেন, নতুনরা সবাই অনেক ভালো লিখেন। বিশেষ করে কারোর নাম নিতে চান না তিনি। বর্তমানে সবার লেখার মান অনেক ভালো বলে মনে করেন তিনি।

প্রবাসীদের কাছে বাংলা বই এখনো সহজলভ্য হয়নি। পাঠক চাইলেও সবসময় বই সংগ্রহ করতে পারেন না। এ বিষয়ে তিনি জানান যে তারা চাচ্ছেন বিদেশে বই মেলার আয়োজন করতে। এছাড়াও তিনি ব্যক্তিগত ভাবে একটি সংস্থার সাথে মিলে এই বিয়য়ে উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন এখন।

লেখক ফরহাদ হোসেন আগে চিত্রনাট্য লিখতেন এবং পরিচালনাও করতেন। চলচিত্র নির্মানের অভিপ্রায় আছে কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সবারই চূড়ান্ত লক্ষ্য থাকে চলচ্চিত্র নির্মানের, উনারও তেমন চলচ্চিত্র তৈরির ইচ্ছা আছে।

মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা পছন্দ করেন তিনি। শ্রাবণ মেঘের দিন সিনেমাটি তার খুব প্রিয় একটি সিনেমা। সিনেমা থেকে অনেক কিছুই তিনি গ্রহণ করেন বলে জানান। এমনকি পরবর্তীতে এসব শিক্ষা নিজের জীবনে ও লেখনিতে প্রয়োগ করেন বলে জানান তিনি।

নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রথমত, তিনি অত্যন্ত আবেগী একজন মানুষ। দ্বিতীয়ত, তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন না। নিজের দুঃখ, কষ্ট কাউকে বুঝতে দেননা। আর সর্বশেষ, তার বন্ধুভাগ্য খুবই ভালো। তবে, বন্ধুরা তাকে বুঝতে পারেন না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

লেখক ফরহাদ হোসেন মৃত্যুর পর কিভাবে স্মরণীয় হতে চান এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনি মনে করেন না তিনি এমন কিছু করতে পেরেছেন যে মানুষ তাকে মৃত্যুর পর মনে রাখবে। তবে যদি কোন ইচ্ছা থেকে থাকে তবে সেটি হলো, তিনি চান মানুষ তাকে একজন ভালো মানুষ হিসেবে মনে রাখুক। একজন ভালো মানুষ হিসেবে সকলের মাঝে বেঁচে থাকতে চান তিনি।

লিখেছেন – রোমান উদ্দিন