মাহমুদুর রহমান মান্না: সমাজ সংস্কারের একজন অগ্রনায়ক

মাহমুদুর রহমান মান্না: সমাজ সংস্কারের একজন অগ্রনায়ক

বাংলাদেশের রাজনীতি এবং গণমাধ্যমে এক সুপরিচিত মুখ হলেন মাহমুদুর রহমান মান্না। ছাত্রজীবন থেকে তিনি সমাজ পরিবর্তনের মনন নিয়ে রাজনীতির সাথে যুক্ত। ১৯৬৮ সালে তিনি ছাত্রলীগ এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন এবং চাকসুর জিএস নির্বাচিত হন ১৯৭২ সালে। ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৭৬ সালে জাসদ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে ঢাকায় এসে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তীতে, ১৯৮০ সালে তিনি বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ গঠন করেন। ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় হয়ে পড়েন। এরপর ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এ যোগ দিয়ে ২০০৭ সালে আলোচিত এক এগারো সরকারের সময় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৯ সালে সংস্কারধর্মী মনোভাবের কারণে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পদ থেকে বাদ পড়ে যান। তখন তিনি নাগরিক ঐক্য নামের রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বর্তমানে তিনি এই দলের সভাপতি হিসেবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন পূর্বক জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ গ্রহণ করেছিলেন। কবিতার সাথে আলাপচারিতায় তিনি তার অতীত ও বর্তমানের রাজনীতি, দেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরস্থিতি নিয়ে নানা বিশ্লেষণধর্মী বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।

তিনি জানান, দীর্ঘ একটা সময় ধরে তিনি এবং অন্যান্য বিরোধীদলগুলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। ২০১৪ এ সকল বিরোধী দলকে বাইরে রেখে নির্বাচন হয়েছে,‌ ২০১৮ তেও নির্বাচনের নামে হয়েছে প্রহসন, তাই এখন দেশের জনগণ তাদের ভোটাধিকার তথা একটি সার্বিক গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি কামনা করেন বলে তিনি মন্তব্য করেন। এছাড়া ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরাট বিস্তৃতি, দেশের স্বাধীনতার সাথে তাদের সম্পর্ক স্মরণ করে তিনি বলেন, বিগত ১০-১২ বছরে এই দল তাদের রাজনৈতিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে, মানুষের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। তাই মাহমুদুর রহমান মনে করেন, বিরোধীদল হিসেবে ক্ষমতার লড়াইয়ে হেরে গেলেও রাজনীতির মাঠে সরকারের সকল অপকর্ম মানুষের সামনে তুলে ধরতে পেরে তারা বিজয়ী হয়েছেন। এখন তীব্র আন্দোলন ছাড়া দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে মনে করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই দীর্ঘসময়ে কেন আন্দোলনগুলো সফলতার মুখ দেখেনি, এর পেছনে যেমন সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন দায়ী, তেমনি বিরোধীদলগুলো তাদের আন্দোলন পরিকল্পনায় বা বাস্তবায়নে ভুল করেছে কিনা, নিজেদের নীতি-কৌশলের ক্ষেত্রে ভুল করেছে কিনা এই প্রশ্নগুলোও করা জরুরি। যেমন, ২০১৪ এর জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি কৌশলগত ভুল করেছিল কিনা এই বিতর্ক থেকেই যায়। এর পাশাপাশি, এমন অনেক সময় গেছে যখন হয়ত আন্দোলন, কর্মসূচি থাকার দরকার ছিল, বলিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ দরকার ছিল যা দেখা যায়নি। এর পেছনে অবশ্যই নেতৃত্বের একটি অভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এরসাথে তিনি এটাও বলেন যে, এই সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব নয় এবং এই সরকারও স্বাভাবিক নিয়মে ক্ষমতা ত্যাগ করবে না। তাই আন্দোলনই পরিবর্তনের একমাত্র গতিপথ এবং সে আন্দোলনের ধারা এবং রূপরেখা হয়ত মাঠে নামার পরই বোঝা যাবে।

তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক দিক থেকে এদেশের জন্য একটি সুষ্ঠু অবকাঠামো তৈরি করে দিয়ে যাওয়া সম্ভব। একটি বড় সমস্যা হল, এদেশের ভবিষ্যত নিয়ে একেকজন একেক রকম ভাবেন, কেউ হয়ত সমাজতন্ত্র চান, কেউ গণতন্ত্র বা কল্যাণ রাষ্ট্র, আবার কেউ শুধু ক্ষমতা অধিগ্রহন করতে চান। মাহমুদুর রহমান মনে করেন, এদেশের মানুষ অত্যন্ত ধৈর্যশীল, সহনশীল এবং পরিশ্রমী। তাই, এদেশে সব ধরনের পরিবর্তনই সম্ভব। বিশেষ করে যদি তরুণদেরকে উদ্বুদ্ধ করা যায়, তাদেরকে কল্যাণের কাজে ও সুস্থ রাজনৈতিক ব্যবস্থার পুনর্গঠনের কাজে নিয়োজিত করা যায়, তাহলে আগামী দীর্ঘসময়ে দেশ তাদের থেকে সুবিধা ভোগ করতে পারবে। এদেশের একটি বড় জনগোষ্ঠী দরিদ্র ও বেকার। যদি মানুষই না খেতে পায় তাহলে লোক দেখানো তথাকথিত উন্নয়নে বিশেষ লাভ হবে না। তাই প্রবীন এই রাজনীতিক মনে করেন, প্রতি বছর যে লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয় সেটা রোধ করে এই অর্থ বরং দেশের এই জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় করা উচিৎ। উন্নতির মাপকাঠি হিসেবে লক্ষ হওয়া উচিৎ শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বিচারব্যবস্থাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়া। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও এখন ভঙ্গুর যেখান শিক্ষার চেয়ে বেশি সহিংসতা বা বাণিজ্য প্রাধান্য পায়। তিনি বলেন, এই ব্যাপারগুলোতে পরিবর্তন আনতে পারলে বাংলাদেশকে আপাদমস্তক পরিবর্তন করা সম্ভব।

এ ধরনের সমস্যাগুলো ছাড়াও সড়ক নিরাপত্তা, নারীর স্বাধীনতা, বেকারত্ব দূরীকরণের মত সব ব্যাপারেই নিজস্ব কর্মপরিল্পনা আছে বলে জানান মাহমুদুর রহমান। তিনি মনে করেন, এ ধরনের যেকোনো কাজের আগে প্রশাসনিক সংস্কার দরকার ও আধুনিকায়ন দরকার, যাতে করে লেনদেনে দুর্নীতির সুযোগ না থাকে। তার পরিকল্পনা মতে, তিনি ৬ কোটি নিম্ন আয়ের বা দরিদ্র মানুষের ডাটাবেজ তৈরি করতে চান যার উপর ভিত্তি করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের প্রত্যেকের কাছে এক হাজার টাকা করে প্রতি মাসে পৌছে যাবে। এর জন্য হয়ত বাহাত্তর হাজার কোটি টাকা লাগবে, যেটা খুব বেশি নয়। কারণ এদেশে উচ্চবিত্তের অনেকে ঋণ নিয়ে কোটি কোটি টাকা  বাইরে পাচার করে দিচ্ছে, কিন্তু এই টাকা গরীব মানুষদের দিলে তারা তাদের সংসার চালিয়ে দেশের মধ্যেই বিনিয়োগ করতে পারবে। এতে করে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক নিরপত্তা নিশ্চিত হবে। এছাড়া শিক্ষা, বিচারব্যবস্থা, চিকিৎসার মতো ব্যাপারগুলোতেও নজর দেয়া প্রয়োজন। তিনি নিজে কল্যাণ রাষ্ট্রব্যবস্থার একজন প্রচারক, কিন্তু বলেন, কোনো গোড়া কার্যবিধির অনুসরণ না করে প্রয়োজন অনুসারে যখন যে কাজ করা দরকার, তাই করবেন।

দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, আমরা যদি আমাদের ডায়াবেটিক হাসপাতাল, আইসিডিডিআরবি কিংবা গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের দিকে তাকাই, তাহলে স্পষ্টত বোঝা যায় কম খরচে অতি উন্নত চিকিৎসা প্রদান করা সহজেই সম্ভব। দরকার হলে কমিউনিটি হাসপাতালের মত ব্যবস্থা স্থাপন করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য উপজেলা বা থানা পর্যায়ে সুচিকিৎসা সরবরাহ করা সম্ভব। শিক্ষার ক্ষেত্রেও মনে রাখতে হবে, বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের জায়গা নয়। তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ও শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। তৃণমূল পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে শিক্ষাকে পৌছে দিতে হবে।

স্বাধীনতা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দেশের রাজনীতির সকল উত্থান-পতন সামনে থেকে দেখা ঋদ্ধ এই রাজনীতিবিদ মনে করেন, আজ পর্যন্ত পরিপূর্ণ গণতন্ত্র আমরা কখনো পাইনি। সে জন্যেই ৫০ বছরে যেখানে থাকার কথা ছিল সেখানে বাংলাদেশ পৌঁছাতে পারে নি। বরং ক্ষমতার বদল পালাবদলের রণক্ষেত্রে পড়ে এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। তাই তিনি উন্নয়নের স্বপ্ন, পরিবর্তনের স্বপ্ন নতুন করে মানুষকে দেখাতে চান। প্রতিনিয়ত এদেশ থেকে যে মেধাগুলো চলে যাচ্ছে, তাদের কাজে লাগানোর মতো সুষ্ঠু পরিবেশ ও ক্ষেত্র গড়ে তুলতে চান। যতদিন বেঁচে আছেন, ততদিন মানুষের সম্মান এবং ভালোবাসা নিয়ে তিনি বেঁচে থাকতে চান।

রাজনীতিবিদ হওয়ার পাশাপাশি মাহমুদুর রহমান মান্না একজন লেখকও, যার বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৫। সেজন্যেই সামাজিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াও তাঁর স্বপ্ন। মানুষের চিন্তা-ভাবনা দৈন্য দূর করতে তাদের সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্যে কাজ করে যেতে চান তিনি। নানা সমস্যায় জর্জরিত আমাদের সমাজব্যবস্থায় মানুষের জন্য কাজ করতে যে মানবিকতা দরকার, সে মানবিকতার চিন্তাও কেউ করে না বলে তিনি মনে করেন। বলেন, জাতিগতভাবে আমরা আবেগ যতটা পেয়েছি, যুক্তিসিদ্ধ ভালোবাসা ততটা পাইনি। আমাদের রাজনীতির কারণেই আমরা সামাজিক ক্ষেত্রে চিন্তাশীল সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছি। নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বলেন, দলীয় রাজনীতি করেও সবার গ্রহনযোগ্যতা অর্জন করা যায়, সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করা যায়, যেমনটা করে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশকে ভালোবেসে, দেশের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে, দেশে একটি সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়তা করতে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের প্রতি তিনি আহবান জানান। তার সকল সদিচ্ছা ও শুভচেষ্টা সফল হক এই প্রত্যাশাই রইল।

ডা: আলিম আক্তার ভুইয়া: নিউরোলজির একজন পথিকৃৎ

ডা: আলিম আক্তার ভুইয়া: নিউরোলজির একজন পথিকৃৎ

ডা: আলিম আক্তার ভুইয়া আমেরিকান বোর্ড থেকে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বাংলাদেশের একমাত্র নিউরোলজি ও এপিলেপসি বিশেষজ্ঞ। তিনি ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে, তিনি লন্ডন স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন থেকে ডিপ্লোমা ইন ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (ডিটিএমএন্ডএইচ) অর্জন করেন। ডাঃ ভুইয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটি ইউনিভার্সিটির অধীনে কুইন্স হাসপাতাল সেন্টার (মাউন্ট সিনাই হাসপাতালের সাথে অধিভুক্ত) থেকে ইন্টারনাল মেডিসিনে স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তিনি নিউরোলজি ও পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপ ইন এপিলেপসি এবং ক্লিনিক্যাল নিউরো – ফিজিওলজিতে স্নাতকোত্তর রেসিডেন্সি প্রশিক্ষণ করেছেন স্টেট ইউনিভার্সিটি অফ নিউ ইয়র্ক, সিরাকিউস, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সেখানে, তিনি পরপর দুই বছর (১৯৯৭ এবং ১৯৯৮) মেডিকেল ছাত্রদের শিক্ষাদানে শ্রেষ্ঠত্বের জন্য বিভাগীয় আবাসিক শিক্ষাদান পুরস্কারে ভূষিত হন। তিনি আমেরিকান বোর্ড অফ সাইকিয়াট্রি অ্যান্ড নিউরোলজি থেকে নিউরোলজিতে বোর্ড সার্টিফিকেশনও পেয়েছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সিরাকিউসে ভেটেরানস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ভিএ) হাসপাতালে তিনি পরামর্শক নিউরোলজিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এবং ১৯৯৯ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের নিউরোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রধান ছিলেন। বর্তমানে তিনি ইউনাইটেড হাসপাতালে ফুল টাইম সিনিয়র কনসালটেন্ট হিসেবে কর্মরত আছেন। নিউরোলজিতে তাঁর একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রকাশনা রয়েছে।

বিদেশে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করলেও দেশের টানে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি সানন্দে তাঁর নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দেশের রোগীদের সেবায় নিয়োজিত করছেন। দেশের নিউরোলজির বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেন, আগের চেয়ে অনেক অগ্রসর হলেও আমাদের দেশে প্রায় ২৫০ জনের মত নিউরোলজিস্ট আছেন, যা ১৭ কোটি মানুষের জন্য অপ্রতুল। আমেরিকাতে এর দ্বিগুণ জনসংখ্যার জন্য নিউরোলজিস্ট আছেন ১৮,০০০ এর মত, যে সংখ্যার মাধ্যমে আমাদের দেশের এই কমতি আরও স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। কোভিড-১৯ ভাইরাস নিয়ে তিনি জানান, এটি হলো সার্স-২, ইনফ্লুয়েঞ্জা ক্যাটাগরির একটি সুনির্দিষ্ট ভাইরাস, যার কাছাকাছি দুটি ভাইরাস হল সার্স-১ এবং মার্স ভাইরাস যার প্রকোপ মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে দেখা গিয়েছে। এটি বেশ সংক্রামক হওয়ার কারণে ইউরোপ ও আমেরিকাতে অনেক লোক হতাহত হয়েছে। আমেরিকার মত দেশে যেখানে উচ্চমৃত্যু হার দেখা গেছে সেখানে বাংলাদেশে আশ্চর্যজনকভাবে মৃত্যুর হার বেশ কম, যা ডাক্তার ও গবেষকদের জন্য কৌতূহলোদ্দীপক। ডা: আলিম আক্তার ভুইয়া মনে করেন, হয়তো পরিবেশ ও আবহাওয়াজনিত কারণে পশ্চিমা বিশ্বের তুলনায় উপমহাদেশে ভাইরাসের সংক্রমন কম দেখা গিয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বের ঠান্ডা আবহাওয়া ভাইরাসের সংক্রমণের জন্য অধিকতর উপযোগী। এছাড়াও শুরুর দিকে এ ভাইরাস সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না থাকায় প্রয়োজনীয় তথ্য উদ্ধার ও পদক্ষেপ নির্ধারণে অনেক সময় লেগে গিয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। আমাদের মতো দেশে যেখানে ঘনবসতি, দুর্বল চিকিৎসা অবকাঠামোর মতো অসংখ্য সমস্যা রয়েছে, সেখানে তুলনামূলক এত কম সংক্রমণ সৃষ্টিকর্তার দয়া হিসেবে দেখছেন তিনি।

ডা: আলিম কাছ থেকে আমরা নিউরোলজির একটি সুন্দর ব্যাখ্যাও পেয়ে যাই। তিনি বলেন, নিউরোলজি মূলত মানুষের মস্তিষ্ক ও মেরুদন্ডসহ সার্বিক স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে কাজ করা একটি বিশেষায়িত শাখা। আমাদের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করে মূলত দুটি সিস্টেম- স্নায়ুতন্ত্র বা নার্ভাস সিস্টেম এবং এন্ডোক্রাইন সিস্টেম। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যত কাজ রয়েছে সবই আমাদের মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। এই স্নায়ুতন্ত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে স্ট্রোকের মতো নানা রোগ শরীরে বাসা বাঁধে। এই ধরনের নানা রোগ আমাদের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রভাব ফেলে। এই সকল জটিল বিষয় নিয়েই নিউরোলজি, যার প্রায় ৪০ টির মতো শাখা প্রশাখা রয়েছে ইউএসএ-তে। ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম এমনই একটি জটিল সমস্যা। ৬০-৬৫ শতাংশ ডিমেনশিয়া রোগীর রোগের মূল কারণ হল আলঝাইমার। এর বাইরেও আরও বেশ কিছু প্রকারের ডিমেনশিয়া রয়েছে। এর মধ্যে কিছু চিকিৎসাযোগ্য, যেমন ভিটামিন বি১২ এর ঘাটতি, থাইরয়েড এর সমস্যা, সিফিলিস ইত্যাদি। ডিমেনশিয়ার ফলে রোগী সাধারণত ৫০-৬০ বছরের পর থেকে ধীরে ধীরে স্মৃতিভ্রষ্ট হতে শুরু করে, তার স্মরণশক্তি হারিয়ে যেতে থাকে, তাদের কথা বলতে এবং বুঝতে সমস্যা হয়, এভাবে আস্তে আস্তে সমস্যার শুরু হয়।

এছাড়াও সারা দুনিয়াতে বর্তমানে ১-২ শতাংশ জনগোষ্ঠীর এপিলেপ্সি বা মৃগীরোগ আছে বলে আমরা জানতে পারি ডা: আলিম আক্তার ভুইয়ার কাছ থেকে। আমেরিকা তে এই সংখ্যা প্রায় ৩৫ লক্ষ। বাংলাদেশে কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও তা প্রায় ২৫-৩০ লক্ষের কাছাকাছি। নিম্নমানের মাতৃকালীন চিকিৎসা, মাথায় আঘাত পাওয়া, দুর্ঘটনা বা সন্ত্রাসের কবলে পড়া, তৃতীয় বিশ্বের এমন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনাগুলোর জন্য উন্নত বিশ্বের চেয়ে এপিলেপ্সির রোগীর সংখ্যা বেশি বলে তাঁর কাছ থেকে জানা যায়। এই রোগে মস্তিষ্কের কোনো অংশে হঠাৎ বজ্রপাতের মতো বৈদ্যুতিক সঞ্চালন ঘটে। প্রায় ৪০ ধরনের এপিলেপ্সি রয়েছে এবং এর মধ্যে ৭০ শতাংশ এপিলেপ্সি ওষুধ বা সাধারণ চিকিৎসা দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাকি ৩০ শতাংশের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে উন্নত বিশ্বে, কিন্তু বাংলাদেশের মতো দেশে তা বিরল বা নেই বললেই চলে। এছাড়া ব্রেইন টিউমারের মতো সমস্যায় প্রয়োজন অস্ত্রোপচারজনিত চিকিৎসা। এর বাইরে টিউমারের ধরনের উপর নির্ভর করে অনেক সময় রেডিয়েশন থেরাপিও প্রয়োগ করা হয়। এরপর ডা: আলিম এর মতো সুযোগ্য নিউরোসার্জনরা রোগীদের পরবর্তী সুস্থ্যতা নিশ্চিত করার কাজ করেন।

তিনি জানান, গত তিন চার দশকে নিউরোলজির ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি সাধন হয়েছে। বিভিন্ন উচ্চমানের গবেষণার ফলে উন্নত চিকিৎসাপদ্ধতি এবং ক্ষেত্রবিশেষে জেনেটিক চিকিৎসার ব্যবহারও হচ্ছে। আমাদের বাংলাদেশও উন্নত বিশ্বের চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও খুব দ্রুতগতিতে চিকিৎসাপদ্ধতির দিক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ডা: আলিম মনে করেন গত ১০-১৫ বছরেই আমাদের চিকিৎসাক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আমেরিকাতে যেমন চিকিৎসা প্রদান করা হয় তার ৯০-৯৫ শতাংশ বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে প্রদান করা সম্ভব। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে দক্ষ জনশক্তি তৈরির উদ্দেশ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ পরিচালিত হচ্ছে। এছাড়া, যে প্রশিক্ষণ এবং পরীক্ষাসমূহ এখানে সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলোর জন্য ভারতীয় বিভিন্ন ল্যাবের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ বজায় রাখা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।

সবশেষে তিনি জানান, তাঁর ইচ্ছা বাংলাদেশে একদল দক্ষ নিউরোলজিস্ট এবং একটি উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা তৈরি করে দিয়ে যাওয়া। তিনি সেই লক্ষ্য নিয়েই ডাক্তারদের পোস্ট-গ্রাজুয়েট ট্রেনিং এর সাথে নিয়মিত যুক্ত থাকছেন, নিজ হাতে তাদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তিনি চান নিজের অর্জিত জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দিতে, যাতে করে পাশ্চিমা বিশ্ব থেকে শিখে আসা তাঁর জ্ঞান এবং কর্মপদ্ধতি কাজে লাগিয়ে এ দেশের নিউরোলজি উন্নত বিশ্বের সাথে পাল্লা দিতে সক্ষম হয়। তাঁর এই মহৎ উদ্দেশ্য আমাদের দেশের জন্য উত্তরোত্তর কল্যান বয়ে আনুক এই প্রত্যাশা রইল।

একজন স্বপ্নদ্রষ্টা: ড. ফয়সাল কাদের

একজন স্বপ্নদ্রষ্টা: ড. ফয়সাল কাদের

ডিজিটাল বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রযুক্তির সাথে তাল মেলানো সবচেয়ে জরুরী। বর্তমান বিশ্বে একজন মানুষ যত বেশি প্রযুক্তিগত বিদ্যায় পারদর্শী হবে সে তত বেশি খাপ খাইয়ে নিয়ে নিজেকে দক্ষ হিসেবে প্রমাণ করতে পারবে। মানুষ শুধু কর্মক্ষেত্রে নয় জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে সফল হোক এমন স্বপ্ন নিয়ে প্রতিনিয়ত কাজ করছেন একদল মানুষ, কাজ করছেন নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্যের স্বপ্ন পূরনে। যারা কেবল নিজের সফলতা নয়, নিজের দেশের মানুষের কথা চিন্তা করছেন। আজকে ঠিক এমন একজন মানুষের কথা বলবো যার স্বপ্ন আকাশ ছোঁয়া। যিনি চান তার দেশের প্রতিটা শিক্ষার্থী পড়াশোনায় ও কর্মক্ষেত্রে দক্ষ হয়ে উঠুক। যিনি একাধারে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী ও সফল উদ্যোক্তা। বলছি বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ড. ফয়সাল কাদেরের কথা।

ড. ফয়সাল কাদের ঢাকার সেন্ট জোসেফে পড়াশোনা করেছেন। এরপর তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। তিনি উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে স্নাতক এবং জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সাইন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং এ স্নাতকোত্তর ডিগ্রী অর্জন করেন। এরপর ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড থেকে সাইবার সিকিউরিটি এবং ডেটা সায়েন্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন তিনি। সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা সায়েন্স, হিউম্যান কম্পিউটার ইন্টারঅ্যাকশন, প্রক্রিয়া অপ্টিমাইজেশনের পাশাপাশি হেলথ আইটিতেও তার একাডেমিক আগ্রহ রয়েছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে তার রয়েছে অসংখ্য প্রকাশনা। বর্তমানে তিনি ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডে তাদের কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজির জন্য আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স মেশিন লার্নিং, ডেটা সাইন্স ও সাইবার সিকিউরিটির শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন। তিনি TISTA বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কর্পোরেশন এবং বর্তমান সংস্থা Technuf এর সহ প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের AABEA সেন্ট্রালের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ড. ফয়সাল কাদের শুধুমাত্র যে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে দিনপাত করেন বিষয়টি এমন নয়। বাংলা ও বাঙ্গালী সংস্কৃতির উপর তার অগাধ ভালোবাসা রয়েছে। তাইতো, শত ব্যস্ততার মাঝেও সপ্তাহে ছুটির দিনগুলো একান্তই তার ব্যক্তিগত। ছুটির দিনগুলোতে তিনি গান নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, চর্চা করেন তার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত। সংস্কৃতিমনা পরিবারের সন্তান ফয়সাল কাদের সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছেন। তার বড় বোন নতুন কুঁড়িতে প্রথম হয়েছিলেন, ছায়ানটেও প্রথম হয়েছিলেন। ৩-৪ বছর বয়স থেকেই ফয়সাল কাদেরের গানের হাতেখড়ি হয়। ছায়ানটে ভর্তি হয়েছিলেন বলেও জানান তিনি। তবে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে চলে যাওয়ার কারনে ছায়ানটে ইতি টানতে হয়েছে তার। তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখা বন্ধ হলেও বিদেশে গিয়েও গানের চর্চা অব্যাহত রাখেন তিনি।

ড.ফয়সাল কাদের প্রচন্ড কর্মব্যস্ত একজন মানুষ। মাঝেমাঝে তার কাছে মনে হয় ২৪ ঘন্টায় দিন না হয়ে ৩৬ ঘন্টা হলে হয়তো ভালো হতো। তবে মানুষের জীবনে অনেক স্বপ্ন থাকে এবং সেই স্বপ্নকে আগলে রাখার জন্য শত কষ্টকেও কষ্ট বলে মনে হয়না তার। তাইতো রাত দিনের হিসেব করেন না তিনি। অনেক চেষ্টায় গড়ে তুলেছেন ‘Technuf’ নামে নিজের কোম্পানি। নাম শুনলেই নিজের দেশকে অনুভব করা যায়। নামকরনের সার্থকতা জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ভালো নাম পাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার। তাছাড়া তিনি চাচ্ছিলেন তার কোম্পানির সাথে বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা থাকুক। আবার যেহেতু এটি প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান সেহেতু নাম শুনে যাতে বুঝা যায় কোন ধরনের প্রতিষ্ঠান। তাই তিনি টেকনোলজির টেক শব্দটি ব্যাবহার করেন। টেকনোলজি থেকে টেক শব্দটি গ্রহন করার পর তার মাথায় বাংলাদেশের এই জায়গাটির নাম আসলো যা ব্যবহার করলে তার দুটো উদ্যেশ্যই পূরণ হবে বলে মনে করেন তিনি। তাই তার কোম্পানিটির নাম ‘টেকনাফ’।

তিনি Stands for American Association of Engineering and Architects -AABEA নামক সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এ প্রসঙ্গে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম যে এটি কী, এর উদ্যেশ্য কী, বাংলাদেশের উন্নয়নে এর কোন ভূমিকা আছে কি না। তিনি জানান, এটি হলো প্রবাসী প্রকৌশলীদের একটি সংগঠন যা প্রায় ৩৮ বছর আগে আনুষ্ঠানিক রুপ লাভ করেছিল। এর উদ্যেশ্য বাংলাদেশ থেকে যারা পড়াশোনার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান তাদেরকে সাহায্য করা। অনেকেই দেশ থেকে অনেক কিছু শিখে আসেন না যেমন কিভাবে কোথাও আবেদন করতে হয়, কিভাবে বৃত্তির জন্য আবেদন করতে কয়, কোথায় গেলে তারা ভালো সুবিধা পাবে এই উৎসগুলোর সন্ধান দেয়া। এছাড়াও পরিবার পরিজন ছেড়ে আসা মানুষগুলোকে একটু আগলে রাখার কাজও করে থাকে এ সংগঠনটি। তবে শুধু প্রকৌশলীই নন বাংলাদেশ থেকে আসা যেকোনো সেক্টরের ছাত্রছাত্রীদের জন্যও সংগঠনটি কিছু কাজ করে থাকে বলে জানান তিনি। যেমন -প্রতিটা ফিল্ডের জন্য কম্পিউটার কোর্স খুবই জরুরী। অনেক শিক্ষার্থীর কম্পিউটারে দক্ষতা না থাকায় হিমশিম খান বলে জানান তিনি। আর তাদের জন্য এ সংগঠন থেকে কম্পিউটার লিটারেসি প্রোগাম পরিচালনা করা হয়। শিক্ষার্থীদেরকে এই প্রোগ্রামগুলোতে অন্তর্ভুক্ত করে কম্পিউটারের বেসিক কোর্সগুলো করানো হয়। যেমন- কিভাবে প্রেজেন্টেশন তৈরি করতে হয়, কিভাবে ডকুমেন্ট তৈরি করতে হয়, এক্সেল এর কাজ, এমনকি যে যেই ফিল্ডে আসে সেই ফিল্ড সম্পর্কিত কাজও শেখানো হয়। আর এসব কাজ সব বিনামূল্যে করানো হয় বলে জানান তিনি। তিনি আরও জানান, এসব কাজের অর্থায়ন সম্পূর্ণটাই আসে নিজেদের অনুদান এবং সদস্যপদের মাধ্যমে। তিনি বলেন, বিদেশে টিউশন ফী অনেক বেশি, সব শিক্ষার্থীদের সকল খরচ বহন করার সামর্থ নাই। এমন অবস্থায় অনেকেই অর্থ চিন্তা করতে গিয়ে পড়াশোনার ক্ষতি করে ফেলেন, তাই শিক্ষার্থীদেরকে যেন এমন অবস্থায় না পড়তে হয় সেজন্যই এসব কোর্সের বাইরে তারা শিক্ষার্থীদেরকে অর্থনৈতিক সহায়তাও করে থাকেন।

শিক্ষার্থীরা কিভাবে এ সংগঠনের খোঁজ পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, AABEA.Org লিখে সার্চ করলেই তাদের সকল তথ্য পাওয়া যাবে। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ১১ টা স্টেটেই তাদের উপস্থিতি আছে। প্রতিটা স্টেটেই তারা সাহায্য করে থাকে। শুধু মাত্র শিক্ষার্থীদের জন্যই নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও যেকোনো মানবিক ডাকে সংগঠনটি সাড়া দেয় বলে তিনি জানান। বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দূর্যোগে সংগঠনটি সাহায্য করেন, এমনকি কোভিড-১৯ এর সময়ও অনেক চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, প্রতি দুই বছর পরপর সংগঠনটির বাৎসরিক সম্মেলন হয়। সেখানে পুরো আমেরিকার ইঞ্জিনিয়াররা অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও, সংগঠনটির ইয়ুথ প্রোগ্রাম আছে বলেও জানান তিনি। যেখানে প্রতিটা কলেজে কলেজে কিভাবে একজন সফল মানুষ হওয়া যায়, কিভাবে চাকরির আবেদন করতে হয়, কিভাবে সুন্দরভাবে ইন্টারভিও দিতে হয় ইত্যাদি বিষয়গুলো শেখানো সহ ক্যারিয়ার নিয়ে আরও অনেক প্রাথমিক ধারণাগুলো দেয়া হয়। ক্যারিয়ার বিষয়ক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সংগঠনটি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করে বলে জানিয়েছেন তিনি।

শুধু প্রবাসী বাংলাদেশীদের নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নেও সংগঠনটির ভূমিকা আছে বলে তিনি জানান। বাংলাদেশ থেকে ১১ টি আইটি কোম্পানি সংগঠনটির সম্মেলনে যোগদান করেছে। এছাড়া, পদ্মা সেতু ও যমুনা সেতু নির্মানেও সংগঠনটির ভূমিকা আছে বলে জানান তিনি। বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ও ডিটিআই – এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সংগঠনটি সরাসরি কাজ করে এবং সংগঠনটির মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রচুর প্রজেক্ট হয় বলে জানিয়েছেন তিনি।

যেহেতু তিনি ও তার পরিবার প্রবাসে থাকেন এবং তার মতো অসংখ্য মানুষ পরিবার পরিজন নিয়ে প্রবাসে বসবাস করছেন, সেক্ষেত্রে প্রবাসী জীবনে তাদের সাথে নতুন প্রজন্মের কী ধরণের পরিবর্তন পাওয়া যায় – এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ডিজিটাল যুগ খুব পাওয়ারফুল একটি যুগ। এখানে খুব সহজেই একজন আরেকজনের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে। পূর্ব ও পশ্চিমের সংস্কৃতি খুব সহজেই একে অপরের সাথে মেলবন্ধন তৈরি করতে পারছে বলে মনে করেন তিনি। দুই সংস্কৃতির গানের একটা নতুন ফিউশন সৃষ্টি হচ্ছে। বাচ্চারা ধীরে ধীরে নতুন সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হলেও মূলধারার সংস্কৃতি দেখে দেখে তাদের উপরও প্রভাব পড়ছে। এক্ষেত্রে তিনি তার নিজের ছেলের উদাহরণ দেন- তিনি জানান তার ছেলে ছোট থেকেই গান শেখে, গিটার বাজিয়ে গান করে। যেহেতু বিদেশে বড় হয়েছে সেহেতু সে ইংরেজি গান করে। তবে তিনি এটা লক্ষ করেন ইংরেজি গান হলেও সেখানে বাংলা সংস্কৃতির একটা ছাপ রয়েছে। কিছু কিছু গানে বাংলা ও ইংরেজির ফিউশন সৃষ্টি হয়েছে বলে ধারণা করেন তিনি। আর এই বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে নিচ্ছেন তিনি। তার কাছে মনে হয়, একটি সীমানাহীন পৃথিবী তৈরি হচ্ছে সংস্কৃতির এমব মিশ্রণের ফলে। নতুন প্রজন্মকে নিয়ে তার অনেক আশা কেননা তারা পড়াশোনায় মাল্টিটাস্কিং বলে তিনি মনে করেন। যেকোনো দেশ, জাতি, সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনে তারা বড় হচ্ছে। তাদের জ্ঞানের পরিধি অনেক বেশি বলে দাবি করেন তিনি। তবে শিকড় যাতে মজবুত থাকে সেদিকেও লক্ষ্য রাখা উচিত বলে জানান তিনি। তিনি মনে করেন, শিকড় মজবুতের জন্য নতুন প্রজন্মকে আরও ভালোভাবে সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে।

ড. ফয়সাল কাদেরের এতো কিছু করার পেছনে কাদের অবদান রয়েছে, কাদের অনুপ্রেরণায় তিনি এতদূর পাড়ি দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সবার প্রথমে তার বাবা মায়ের কথা বলেন। বাবা মায়ের অনুপ্রেরণা ছাড়া পড়াশোনায় এতদূর আশা সম্ভব ছিলো না। আর তার মা সংস্কৃতিমনা হওয়ায় তিনি ছোটবেলা থেকেই সংস্কৃতিমনা ছিলেন বলে জানান। আর গানের প্রতি আগ্রহটাও পরিবারের থেকেই পাওয়া। বোন, মা, খালা তাদের দেখে দেখে তিনি গান শেখায় আগ্রহী হয়ে উঠেন।

তবে তিনি জানান, শিক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার অনুপ্রেরণা পান সেন্ট যোসেফের ব্রাদারদের থেকে। তাদের নিষ্ঠা, পরিশ্রম আর আত্মত্যাগ দেখে তারও মনে হয়েছে ব্রাদাররা যদি নিজের দেশ ছেড়ে, মাটি ছেড়ে একটা ভীনদেশে এসে বছরের পর বছর শিক্ষকতা করে কাটিয়ে দিতে পারেন তবে তিনিও পারবেন।

প্রশ্ন করেছিলাম আগামী ১০ বছর পর ড. ফয়সাল কাদের নিজেকে কোন অবস্থানে দেখতে চান? জবাবে তিনি বলেন, ছোটবেলায় তার ইচ্ছা ছিলো ভালো ইঞ্জিনিয়ার হওয়া, শিক্ষকতা করা। তারপর যখন একদিন শিক্ষকতা করার সুযোগ আসলো তখন তিনি তা হাতছাড়া করেননি। ইঞ্জিনিয়ারদের পিএইচডি করার দরকার হয় না, তাও তিনি করেছেন। তার স্বপ্ন বয়স হলে তিনি প্রফেসর হবেন। শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি থাকবেন। ১০ বছর পর নিজেকে শিক্ষক হিসেবেই দেখতে চান তিনি। অফুরন্ত স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে চলছেন এই স্বপ্নবাজ মানুষটি। সকলের কল্যাণের জন্য কাজ করে যেতে

শারমিন লাকি: বহুগুণে গুণান্বিত একজন ব্যক্তিত্ব

শারমিন লাকি: বহুগুণে গুণান্বিত একজন ব্যক্তিত্ব

আজ কথা হচ্ছিল এমন একজন গুণী মানুষের সঙ্গে যিনি একই সাথে জনপ্রিয় মডেল, অভিনেত্রী, রেডিও জকি, উপস্থাপিকা, আবৃত্তি শিল্পীসহ আরও বহু পরিচয়ে পরিচিত। বলছি জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব শারমিন লাকির কথা। যদিও কথাচ্ছলে তিনি জানান যে, কখনো নাটক বা সিনেমায় অভিনয় না করার পরও মানুষের কাছে তার অভিনেত্রী পরিচয়টাই প্রকট হয়ে উঠছে, যার কারণ হয়ত বিভিন্ন বিজ্ঞপনে তার স্বরব উপস্থিতি। নানা গুণে গুণান্বিত এই শিল্পীর কর্মজীবন কিন্তু শিক্ষকতার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় মাস্টার্স করার পর তিনি দুটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন। তার প্রায় ৫ বছর শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। মিডিয়া জগতে “সিদ্দিকা কবির’স রেসিপি” অনুষ্ঠানে সপ্রতিভ ও স্নিগ্ধ উপস্থিতির মাধ্যমে তিনি প্রথম দর্শকদের নজর কাড়েন। যদিও সেই অনুষ্ঠানের কৃতিত্বের সিংহভাগই তিনি দিতে চান শ্রদ্ধেয় সিদ্দিকা কবিরকে, যা তার বিনয়েরই পরিচায়ক। এরপর বাংলাভিশনে ৩ বছর “আপনার আগামী” নামের আরেকটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন। এছাড়াও, ‘চার দেয়ালের কাব্য’ ও ‘মেঘে ঢাকা তারা’র মতো অসংখ্য জনপ্রিয় অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। জনপ্রিয় রেডিও চ্যানেল রেডিও ফূর্তিতে রেডিও জকি হিসেবেও ব্যপক সাড়া ফেলেছেন তিনি।

করোনা আক্রান্ত পৃথিবীর অবস্থা নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যে তার চিন্তার কথা ব্যক্ত করেন, পাশাপাশি এর নির্মূলের প্রার্থনাও করেন। আলাপকালে জানিয়েছেন যে তিনি সবসময় চেষ্টা করেন নিজেকে মানসিকভাবে শক্ত রাখতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজের কাজ করে যেতে। যাতে করে, করোনার এই বিষন্ন প্রকোপ পেয়ে না বসে এবং তার মানসিক সুস্থ্যতা বজায় থাকে। ৮ ভাই-বোনের বিশাল পরিবারে বেড়ে উঠা তার, তাই সেসময় এবং এসময়ের সন্তানদের বেড়ে উঠার পার্থক্য নিয়ে বলতে গিয়ে এ যুগের সন্তানদের সাথে বাবা-মার এক সহজাত সম্পর্কের কথা বলেন, যেখানে সন্তান হয়ত সহজেই মা-বাবার সাথে এমন অনেক কিছু বলতে বা করতে পারে যা আগে ভাবা যেত না। মজা করে বলেন কীভাবে নিজের মা কে মা দিবসে ভালোবাসার কথা বলি বলি করেও বলে উঠতে পারেন না। তিনি মনে করেন, এ যুগে বিশ্বসংস্কৃতির সংস্পর্শে থাকার কারণে সন্তানেরা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিপক্ব। তাই তাদের সাথে মা-বাবার একটি বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্কই শ্রেয়।

এছাড়াও, তিনি নিজের শিক্ষকতা জীবন নিয়ে এই পেশার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান যে, এই পেশার কারণে এখনও যেকোনো অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে এয়ারপোর্ট, সব জায়গাতেই পুরোনো ছাত্র-ছাত্রীদের সম্মান ও ভালোবাসায় সিক্ত হন। আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অত্যন্ত চমৎকারভাবে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, বর্তমানের যে বাংলা, ইংরেজি, মাদরাসা ইত্যাদি বিভিন্ন মাধ্যমের শিক্ষাদান ব্যবস্থা রয়েছে, তা একধরনের বিভাজন সৃষ্টি করছে। এবং তিনি ব্যক্ত করেন, এই শিক্ষাব্যবস্থা খন্ডিত না হয়ে একধরনের সার্বজনীন ও যুগোপযোগী হওয়াই বরং শ্রেয় ছিল।

কথায় কথায় তার ২৬ পর্বের নন-ফিকশন “চন্দ্রবিন্দু” সম্পর্কে বেশকিছু মজার কিছু তথ্য জানা যায়। এ অনুষ্ঠানের ২৬ টি পর্ব ছিল বিভিন্ন বিষয়ের উপর, যেমন – মা, বৃষ্টি, কাক, ভূত ইত্যাদি। গুণী এই উপস্থাপিকে নিজেকে এই অনুষ্ঠানের সাথে তাল মিলিয়ে উপস্থাপন করেছেন ২৬ টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের উপায়ে, পোশাকে এবং ভঙ্গিমায়, যা প্রতিটি পর্বের বিষয়বস্তুকে প্রতিফলিত করতো। সংগীতশিল্পী শাফিন আহমেদের সাথে “গান ও ফান” নামে আরেক জনপ্রিয় অনুষ্ঠান করেছেন তিনি। এছাড়াও নিজের ক্যারিয়ারভিত্তিক একটি অনুষ্ঠান নিয়ে কথা বলেন তিনি যার মাধ্যমে, চিরাচরিত পেশাগুলোর বাইরে আরও অন্যান্য পেশার খোঁজ তিনি তরুণদের সামনে তুলে ধরতেন যা আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে তিনি বাচ্চাদের গল্প বলার একটি শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান “বই পড়ি, জীবন গড়ি” এর সাথে যুক্ত আছেন। শিল্পের বিভিন্ন শাখায় বিচরণ করা এই গুণী শিল্পীর রয়েছে নিজস্ব সংগঠন এবং ইউটিউব চ্যানেল “তাইরে নাইরে না”, যেখানে তিনি ভবিষ্যত বাচকশিল্পী, সংবাদপাঠক ও উপস্থাপকদের শুদ্ধ উচ্চারণ শেখানোর কাজ করছেন। এর বাইরেও তিনি কবিতার সংগঠন “পঞ্চকন্যা”র সাথে যুক্ত আছেন।

কীভাবে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন লাকি সুন্দর গান গাওয়া এবং সুন্দর করে কথা বলার প্রতি তার ভালো লাগার কথা জানান। এজন্যই তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য সংগীত শিল্পীদের সাথে যুক্ত আছেন বলে জানিয়েছেন। এমনকি সংগীতশিল্পী পার্থ বড়ুয়ার সঙ্গে একসাথে “সারাদিন তোমায় ভেবে হলোনা আমার কোনো কাজ” গানটির স্টুডিও রেকর্ডিং এর মজার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন তিনি। স্কুল-কলেজ জীবন নিয়ে কথা হলে তিনি তার দুরন্ত স্কুল জীবনের কথা শোনান। শৈশব ও কৈশোরে তিনি সারাদিন রোদে ঘুরে বেড়াতেন, গাছে চড়তেন, মাঠে নেমে খেলতেন, ছেলেদের সাথে মিলে মারপিট করতেন। এসব ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। পরবর্তীতে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে গিয়ে যখন পরিবর্তন আসে, তখন নিজের অবলোকন এবং অন্যদের প্রশংসায় যে আত্মপ্রেম, আলোড়ন এবং অনুপ্রেরণা তৈরি হয় কিংবা যে সকল অম্লমধুর বিড়ম্বনার সৃষ্টি হয়, সেসব কথাও বলেন।

কথার মাঝে দেশীয় শিল্পের প্রতি তার ভালোবাসার কথা উঠে আসে। তিনি জানান, দেশীয় শিল্প ও পোশাক নিয়ে যারা কাজ করেন, তাদের পাশে থাকার সর্বাত্মক চেষ্টা করেন তিনি। দুটি শাড়ি কিনলে একটি যাতে বাংলাদেশের হয়, এমন ভাবেই চিন্তা করেন শারমিন। আমাদের তাঁতশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সবারই এভাবে এগিয়ে আসা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। আরজে হিসেবে নিজের দুই সিজন রেডিও শো করার অভিজ্ঞতা তিনি আমাদের কাছে তুলে ধরেন। জানান, তিনি চেষ্টা করেন কথার মাঝে যাতে বাংলা ইংরেজির মিশ্রন চলে না আসে। এর পাশাপাশি তিনি বলেন, জকি হিসেবে বিভিন্ন ধরনের শ্রোতাগোষ্ঠীর উপযোগী হিসেবে নিজের গানের তালিকা বা বিষয়বস্তু সাজানো খুবই কঠিন একটি কাজ। তাই তিনি সুস্থ-স্বাভাবিক ভাবে সুন্দর বাংলায় নিজের অনুষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করেছেন। এসবের মাঝেই বাংলা ভাষার প্রতি তার তীব্র সম্মান এবং ভালোবাসা প্রকাশ পায়, ভাষাকে যে তিনি মাতৃসম ভাবেন, বারবার তার কথায় সেটি উঠে আসে। আর তাইতো, বিকৃত উচ্চারণের তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। একইসাথে এও বলেন যে, বর্তমান প্রজন্মের ইচ্ছাকৃত বিকৃত উচ্চারণের জন্যে হয়ত কিছুটা পূর্ববর্তী প্রজন্মও দায়ী, যারা এই ভালোবাসাটা এ প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টি বা সঞ্চালন করতে পারেনি। তাই তিনি চেষ্টা করেন যখন উপস্থাপনার উপর ক্লাস নেন, তখন নিজের জায়গা থেকে সুন্দরভাবে এই ব্যাপারগুলো বুঝিয়ে বলতে।

বিগত ৫-৬ বছর ধরে শারমিন লাকি নিয়মিত উপস্থাপনা ও কবিতা ইত্যাদির উপর সরাসরি কিংবা অনলাইন কোর্স করিয়ে আসছেন। সেখানে বরাবরই তিনি বাংলা ভাষার সৌন্দর্য রক্ষার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক গুরুত্ব দিয়েছেন। ক্ষেত্রবিশেষে নিজের উদাহরণ টেনেও শিক্ষার্থীদের শুদ্ধ বাংলার সৌন্দর্য ও সফলতা দেখানোর চেষ্টা করেন। পাশাপাশ, তিনি এই ব্যাপারটিও তুলে ধরেন যে, বিগত সময়ে যে জকিরা বিকৃত বাংলা বলে শো চালানোর চেষ্টা করেছেন, তাদের কারোর অস্তিত্বই এখন বিনোদন জগতে সেভাবে নেই, তার বিপরীতে বরং যারা অন্তত সুন্দরভাবে বাংলায় উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন, তারাই শ্রোতাদের মন জয় করেছেন এবং এখনও টিকে আছেন।

নিজের জীবনের স্মরণীয় সময় বা কাজ নিয়ে বলতে বললে আবারও তিনি শ্রদ্ধেয় সিদ্দিকা কবিরের কথা তুলে ধরেন। এছাড়া শারমিন জানান, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, ডঃ বিপ্লব বালা, প্রদীপ ঘোষের মত কিছু শিক্ষক তিনি নিজের সময়ে পেয়েছিলেন। তিনি জানান, বর্তমানে তার এ অবস্থানে আসার পিছনে সারা জাকেরের অনেক অবদান আছে। সারা জাকেরদের মত মহৎ মানুষদের সাথে কাটানো সময়গুলোই তার জীবনের স্মরণীয় ও বরণীয় স্মৃতি। এর বাইরে স্মরণীয় ঘটনা হিসেবে তিনি ইউনিভার্সিটি অফ মেলবোর্নে কাটানো একটি দিনের কথা বলেন, যেদিন তার ছেলের নিজস্বসৃষ্ট চিত্রনাট্য পাঠ তিনি দেখতে যান। তিনি বলেন, সেদিনের সেই ঘটনা, সেই পরিবেশ, অভিনয় এবং নিজের সন্তানের চিন্তা-ভাবনার গভীরতা এবং সৃষ্টিশীলতা, যা মা হিসেবে তিনিও ভাবতে পারেননি, এসব মিলিয়ে এটি তাঁর জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটি ঘটনা।

শারমিন লাকির অসাধারন বাগ্মীতার জন্যেই হয়ত কখন বিদায়ের সময় চলে এসেছে তা বোঝাই গেল না। বহুমূখী প্রতিভার অধিকারী এই শিল্পী, অসংখ্য দর্শকের মনে নিজগুণে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি যেন ভালো থাকেন, সুস্থ্য থাকেন, এটাই কামনা রইল।

হারানো দিনের গানওয়ালা : নির্ঝর চৌধুরি

হারানো দিনের গানওয়ালা : নির্ঝর চৌধুরি

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাদকতা হয়তো সুরের মাদকতা। তাইতো সুরের মাঝে যে হারিয়ে যায় অন্য কোন কিছুই আর তাকে টানতে পারে না। আজকে এমন একজন মানুষের কথা বলবো যিনি নিজেকে সুরের মাঝে সবাইকে আসক্ত করেছেন। গানই যার জীবন। বর্তমান সময়ে একের পর এক সফলতা মুঠোবন্দি হয়েছে যার। তিনি হলেন এই প্রজন্মের শ্রোতাপ্রিয় শিল্পী ও সংগীত পরিচালক নির্ঝর চৌধুরী। জনপ্রিয় এই রবীন্দ্র শিল্পীর জন্ম পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়াতে। মনোবিজ্ঞানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করলেও গানের প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় পরবর্তীতে সংগীতে উচ্চশিক্ষা গ্রহন করেন। ২০০০ সাল থেকে তিনি ছায়ানট রবীন্দ্রসংগীত বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। শাস্ত্রীয় সংগীত থেকে শুরু করে পঞ্চকবির গান বা হারানো দিনের গান, সকল ক্ষেত্রে তাঁর গাওয়া গানগুলো পেয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। সংগীতে তার অবদান বাংলা গানকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।

গানের প্রতি তাঁর ভালো লাগার জন্ম কখন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, গানের প্রতি কখন থেকে ভালোবাসা জন্মেছে তিনি নিজেও ঠিক বলতে পারবেন না। তাঁর মা নজরুল, লালনগীতি করতেন। সেই সুবাধে খুব ছোটবেলা থেকেই গানের সাথে পরিচয় হয় তাঁর। তিনি আরও জানান, তাঁর দাদা খুব গান প্রেমী ছিলেন। দাদা সবসময় চাইতেন তার ছেলেরা গান করুক। কিন্তু ছেলেদের দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন নি তিনি, তাই যখন দেখলেন নাতি ভালো গান করছে, তখন মনে করলেন নাতিকে দিয়েই হয়তো তাঁর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতে পারে। সেজন্য তিনি তাকে ৯ বছর বয়সেই ছায়ানটে ভর্তি করেন। তবে, হারমোনিয়ামটা তিনি নিজেই শিখছেন। একা একাই রাগগুলো তুলতে শিখেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ ও কলকাতায় রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী হিসেবে তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত। শুধু রবীন্দ্র সংগীত নয়, সকল ধরণের গানের চর্চা তিনি করেন। এইসব গানের জন্য ‘ধারক’ নামে একটি ফিউশন ব্যান্ড সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। ধারকের ধারণার পেছনের গল্প শুনতে চাইলে তিনি জানান, তিনি যখন ছায়ানটে ছিলেন তখন তিন বছর পর তাদের একটি নির্দিষ্ট গানের ধারা পছন্দ করতে হয়। তখন তিনি রবীন্দ্র সংগীতের উপর নিজের পারদর্শিতা দেখানোর জন্য মনস্থির করেন। তারপর তাদের নজরুল সংগীতের শিক্ষিকা শামিয়া পারভীন শিমুর কিছু কথায় তিনি নতুন করে ভাবেন যে রবীন্দ্র সংগীতের চর্চা করলে তিনি অন্য কোন ঘারানার গানগুলো গাইতে পারবেন না। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিলো তিনি শুধু রবীন্দ্রসংগীত না, সবধরনের গানের চর্চা করে যেতে চান। সেই লক্ষ্যেই মূলত ধারকের জন্ম। ধারকে নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত, পঞ্চ কবির গান, হারানো দিনের গান সবকিছু থাকবে। তবে ধারক এখন বন্ধ আছে। তবে শিঘ্রই ধারক আবার চালু হবে বলে আশা দেখছেন তিনি।

সুরের জাদুকর নির্ঝর চৌধুরি শুধু গানের মাঝেই নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেন নি। গানের পাশাপাশি তিনি উপস্থাপক হিসেবেও পেয়েছেন ব্যাপক জনপ্রিয়তা। বিভিন্ন টিভি শো এবং স্টেজ পারফরমেন্সেও সঞ্চালকের ভূমিকায় দেখা যায় তাকে। দীপ্ত টিভি, চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা ও যমুনা টিভিতে সঞ্চালক হিসেবে অসংখ্যবার তিনি অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছেন। দীপ্ত টিভিতে তিনি রান্নার অনুষ্ঠান পরিচালনা করতেন। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রান্নার প্রতি তার আগ্রহ অনেক আগে থেকেই। যখনই তিনি কোন কারনে অন্যমনষ্ক থাকেন বা কোন কিছু নিয়ে খারাপ লাগা কাজ করে তখন তিনি রান্না করেন। তিনি আরও জানান, সঞ্চালক হিসেবে তার আত্মপ্রকাশ ছায়ানটেই। ছায়ানটে প্রতিবছর নবীন বরণ ও পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়। এক বছর ছায়ানটের অধ্যক্ষ তাঁকে ডেকে বলেন সঞ্চালনা করতে হবে। তখন থেকেই মূলত তিনি সঞ্চালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

এছাড়াও তাঁর আরও একটি বড় পরিচয় হলো তিনি একজন মনোবিজ্ঞানী। জানতে চেয়েছিলাম সংগীতের সাথে মনোবিজ্ঞানের কোন সম্পৃক্ততা আছে কি না। এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, শিল্প ও সাহিত্যের সাথে সংগীতের এক মেলবন্ধন আছে। ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে মিউজিক থেরাপি বেশ জনপ্রিয় বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে মিউজিক থেরাপির খুব বেশি প্রয়োগ দেখা যায় না এখনো। তবে খুব অল্প পরিসরে মিউজিক থেরাপি প্রচলিত আছে। তিনি যেহেতু সংগীতের শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন মনোবিজ্ঞানি সেক্ষেতে তিনি ভবিষ্যতে মিউজিক থেরাপি নিয়ে কাজ করতে চান। এখন অল্প পরিসরে এটি শুরু করেছেন এবং ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা করছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর কাজের ক্ষেত্রটা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। এই কাজে তিনি আত্মতৃপ্তি খুঁজে পান।

বর্তমানে ১৮-২৪ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের মাঝে আত্নহত্যা প্রবণতা অনেক বেশি। তারা একাকিত্বে ভোগেন, হতাশায় থাকেন এবং এর ফলে দেখা যায় হয় আত্মহত্যা করেন কিংবা বিভিন্ন অনৈতিক কাজ করেন। যেহেতু নির্ঝর চৌধুরী লুবনা মরিয়মের প্রতিষ্ঠিত স্কুল ‘কল্পতরু’ তে অধ্যক্ষ হিসেবে আছেন সেজন্য তার কাছে প্রশ্ন ছিলো তরুনদের জন্য কল্পতরু কোন কাজ করছে কি না? উত্তরে তিনি জানান, কল্পতরু মূলত গুলশান বনানির উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার উদ্যেশ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হয়। গুলশান বনানিতে ছেলেমেয়েরা সব ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করে। আর সম্পূর্ণ বাইরের সংস্কৃতির সাথে তাল মিলিয়ে পড়াশোনা করার কারনে দেখা যায় তারা বাংলাটাও ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না। বাংলা সংস্কৃতর সাথে তাদের সেভাবে পরিচয় হয়ে উঠে না। আর নিজের সংস্কৃতি সম্পর্কে ভালোভাবে না জানলে দেশপ্রেমও জাগ্রত হয় না। তাই কল্পতরু আমাদের সংস্কৃতির বিষয়গুলো তাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করে। তিনি আরও বলেন, যান্ত্রিকতার কারনে আমরা একা হয়ে যাই। এককেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার কারনে শেয়ারিং-কেয়ারিং এই ব্যাপারগুলো এখনকার ছেলেমেদের মাঝে আসে না। ছোটবেলায় কেউ যদি আমাদের প্রিয় বন্ধু কে জানতে চাইতো আমরা দ্বিধায় পড়ে যেতাম। কেননা আমাদের প্রিয় বন্ধু কখনো একজন ছিলো না, আমাদের অনেক বন্ধু ছিলো। কিন্তু বর্তমানে ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করলে দেখা যায় বেশিরভাগেরই কোন বন্ধু নেই। যদি বন্ধু থাকেও তবে প্রিয় বন্ধুর তালিকায় কারোরই নাম তারা দিতে পারে না। এসবের কারনেই আত্নহত্যা, হতাশা এসব বেড়েই চলছে। তবে তিনি বলেন, কল্পতরু প্রত্যক্ষ ভাবে হতাশা, আত্মহত্যা কিংবা তরুন প্রজন্মের মানসিক বিকাশ নিয়ে কাজ না করলেও পরোক্ষ ভাবে করছে। কেননা, প্রতিটা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি করে। একসাথে নাচ, গান, আবৃত্তি এসবের চর্চার ফলে তাদের মানসিক বিকাশ হয়, শিশুরা ধীরে ধীরে সামাজিক হয়ে উঠে, তাদের মাঝে শেয়ারিং ও কেয়ারিং এর বোধের সৃষ্টি হয়।

তিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে সফররত আছেন এবং বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন। প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রবাসীরা দেশকে অনেক মিস করেন। বর্তমানে দেশীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টি এসব থেকে মানুষজন দূরে সরে যাচ্ছে। তবে তিনি এটাও জানান, বর্তমানেও অনেক রুচিশীল শ্রোতা রয়েছেন। প্রত্যেকে পুরনো দিনের গানগুলো উপভোগ করেন, হারানো দিনের গানগুলোতে তারা ভালোবাসা খুঁজে পান। এসব দেখে তিনি মুগ্ধ হোন। আরও বেশি করে হারানো গানগুলোকে তখন আকড়ে ধরতে ইচ্ছা হয় তাঁর। সেজন্যই তো আধুনিকতার চেয়েও হারানো দিনের গানগুলো বেশি টানে তাঁকে।

নির্ঝর চৌধুরী বর্তমান বাংলা চলচ্চিত্রে ভিন্ন এক মাত্রা যোগ করেছেন। কিভবে পরিচালক হিসেবে তার আত্নপ্রকাশ ঘটে এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, সংগীত পরিচালক হিসেবে তার আত্নপ্রকাশ খুব বেশি দিনের নয়। ২০০৮ সালে ‘মাটির সুরে’ এলবামের মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করেন। এরপরে আরও প্রায় ১০ টি মিশ্র এলবাম পরিচালনা করেছেন তিনি। কোভিডের সময়ে পন্মপূরাণ সিনেমার মাধ্যমে বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন তিনি। তবে যদিও তার পরিচালনা করা গানটি আর থাকে না সিনেমাটিতে কিন্তু ওই গানের সুবাদে আরও অনেক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়েছে তাঁর। কমার্শিয়াল দুটি সিনেমা -বিফোর আই ডাই ও ফুলজান সিনেমার জন্য গান রচনা করেন তিনি। এরইমধ্যে আফজাল হোসেনের পরিচালিত ‘মানিকের লাল কাঁকড়া’ সিনেমাতে ৩টি গান রচনা করেন এবং ওয়েব ফিল্ম ‘ডার্ক রুমের’ জন্যও তিনি গান লিখেছেন।

মানুষ নিজে যতই সফল হোক একটা নির্দিষ্ট সময় পর গিয়ে প্রত্যকেরই শান্তির দরকার হয়। কেননা ক্লান্তি, মন খারাপ, হতাশা সবার জীবনেই আসে। নির্ঝর চৌধুরীও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি কান্ত হয়ে গেলে মনকে শান্ত করার জন্য কী করেন? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, গান তার নিত্যসঙ্গী তাই অনেকে মন খারাপে গান শুনলেও তিনি শোনেন না। কেননা গান তাকে আরও আবেগপ্রবণ করে তোলে। তিনি ইয়োগা করেন ও মেডিটেশন করেন। মেডিটেশন করলে তার মন ভালো থাকে। তাই প্রতিদিন অল্প সময়ের জ্যন হলেও, নিজেকে ধরে রাখার জন্য তিনি মেডিটেশন করেন।

এই গুণী শিল্পী ২০০৫ সালে শাস্ত্রীয় সংগীত বিভাগে জাতীয় পর্যায়ের সেরা পুরষ্কার অর্জন করেন।
সকলের মন জয় করা এই শিল্পী ১০ বছর পরেও নিজেকে একজন সুখী ও সুস্থ মানুষ হিসেবে দেখতে চান। কেননা প্রতিটা মানু্ষেরই জীবনের একমাত্র উদ্যেশ্য সুখ শান্তি অর্জন। এই সুখ শান্তি অর্জন করতে গিয়েই মানুষের জীবনে এতো সংগ্রাম, এতো কষ্ট, এতো চাহিদা। প্রেম, ভালোবাসা ও সফলতা এসবের মাঝে সুখ খুঁজতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় জীবনের মানে হারিয়ে ফেলে, প্রকৃত সুখ-শান্তি হারিয়ে ফেলে। তাইতো তিনি আজ থেকে ১০ বছর পরেও নিজেকে সুখী মানুষ হিসেবে দেখার ইচ্ছা পোষণ করেন।

আবুবকর হানিপ: দ্য চেঞ্জ মেকার

আবুবকর হানিপ: দ্য চেঞ্জ মেকার

বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হয়েছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) সাবেক ছাত্র ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় তার মালিকানাধীন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (ডব্লিউইউএসটি) বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহের স্থান হয়ে উঠেছে। তিনে নিজে যখন আমেরিকায় গিয়ে চাকরির বাজারে হিমশিম খাচ্ছিলেন তখন প্রযুক্তিখাত ও নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছেন। সেখান থেকেই তার বাংলাদেশিদের আমেরিকার শিক্ষা ও চাকরি বাজারের মূলধারায় নিয়ে আসার চেষ্টা শুরু হয়। গত ১৭ বছরে ইঞ্জিনিয়ার আবুবকর হানিপ সাত হাজার বাংলাদেশিকে উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি দক্ষতা বিকাশে সহায়তা করেছেন এবং আমেরিকান সংস্থাগুলোতে চাকরি পেতে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

একসময় যারা বছরে আয় করতো কেবল ৪০ হাজার ডলার, তারা এখন বছরে গড়ে লাখ ডলার কিংবা তারও বেশী আয় করছেন। তার এই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছিল নিজের বাসায় শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ইনোভেটিভ গ্লোবাল ইউনির্ভাসিটি’ বা ‘আই গ্লোবাল ইউনির্ভাসিটি’ নামক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তিনি ২০২১ সালে ১০০ কোটি টাকায় কিনে নেন এবং নাম দেন ‘ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অফ সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’। এছাড়াও তিনি শিক্ষার্থীদেরকে কর্মমূখী শিক্ষা দেয়ার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন “পিপল এন্ড টেক” যা শিক্ষার্থীদেরকে দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে এটি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। ‘কবিতার সাথে’ অনুষ্ঠানে এই স্বপ্নবাজ ও সফল মানুষটি তার সফলতার নানা গল্প তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, তিনি যখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে আমেরিকায় গিয়ে ভালো চাকরি না পেয়ে গিফট শপে কাজ করা শুরু করেন, তখন বুঝতে পারেন চাকরির বাজার কতটা কঠিন। তারপর পুনঃরায় কম্পিউটার সাইন্সে ডিগ্রী নিয়ে ৬ মাস চাকরি খোঁজার পর যখন অবশেষে সফল হলেন, তখন সেখানে গিয়ে বাংলাদেশিদের অনুপস্থিতি দেখতে পান। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এমনকি, ট্যাক্সির গ্যারাজ চালানো একজন উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশীকে ৬ সপ্তাহ প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেয়ার পর তিনি ১ লক্ষ ডলারের চাকরি পান বলে জানান হানিপ। তার উদ্যোগগুলোর মূলে রয়েছে দক্ষতা বৃদ্ধি। আমেরিকার মত দেশে স্নাতক শেষে একজন শিক্ষার্থীর ৬০-৭০ হাজার ডলারের মতো শিক্ষাঋণ থাকে। এই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে তারা যখন চাকরি পায়না, তখন হতাশা জেঁকে বসে। এছাড়া কর্পোরেট জগতে এন্ট্রি লেভেল চাকরির সুযোগও খুব সীমিত। এর পাশাপাশি, আমেরিকায় প্রতিবছর এইচ১বি ভিসায় প্রায় ৫০০০ দক্ষ কর্মী আনা হয় অন্য দেশ থেকে যেখানে আমেরিকাতেই অনেক নাগরিক স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর করার পরও বেকার বসে থাকে। সেখান থেকেই তিনি একটি শিক্ষাব্যবস্থার কথা চিন্তা করলেন যেখানে প্রশিক্ষণকেও সমান গুরুত্ব দেয়া হবে। তার স্বপ্ন ছিল একসময় বাঙালিরা বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানিগুলোর নেতৃত্ব দেবে। সে জন্যই তিনি বাঙালি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ সৃষ্টির কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ১ মিলিয়ন ডলারের শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া স্নাতক বা স্নাতকোত্তরের পর কোনো শিক্ষার্থী চাকরি না পেলে তার পুরো টিউশন ফি এর টাকা ফেরত দেয়ার উদ্যোগও তারা শীঘ্রই নেবেন বলে তিনি জানান। এই খরচগুলোর সবই তার নিজস্ব অর্থায়নে করা।

পিপল এন্ড টেকের মাধ্যমে আবুবকর হানিপ খুবই স্বল্প সময়ে, মাত্র ৪ মাসের মধ্যে, চাকরি প্রত্যাশীদেরকে কোনো একটি বিষয়ে দক্ষ করে তুলতে চেষ্টা করেছেন, যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে তারা উচ্চ বেতনের চাকরি খুঁজে পেয়েছে। এখন যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, তিনি আশা করছেন বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে, তাদের আনন্দ দেয় এমন গঠনমূলক কাজের ব্যাপারে এখান থেকে জ্ঞান লাভ করবে। তাদেরকে প্রয়োজনীয় সুযোগ দেয়া হবে যাতে তারা নিজেদের পছন্দমতো বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করতে পারে।

সুদক্ষ এই প্রকৌশলী ও শিক্ষকের কাছে জানতে চাওয়া হয়, এই কারিগরী দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মকে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সরিয়ে নেবে কিনা? তাদের কাছে প্রচলিত শিক্ষার গুরুত্ব কমে যাবে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু যারা শিক্ষা সম্পন্ন করার পরও উপযুক্ত দক্ষতার অভাবে চাকরি পাচ্ছে না, তাদের সেই সমস্যা নিয়েই মূলত তিনি কাজ করছেন। এছাড়াও, যারা হয়তো উচ্চতর শিক্ষা সম্পন্ন না করেই প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরি শুরু করেছিলেন, তাদের অনেকেই আবার পরবর্তীতে ফেরত এসে তাদের উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। কারণ, আমেরিকান কর্পোরেট জগতে উন্নতির জন্য উচ্চতর ডিগ্রির অনস্বীকার্য প্রয়োজন রয়েছে।

পিপল এন্ড টেক এর কার্যক্রম সম্পর্কে বলেন, প্রায় ১৫ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি অনলাইন ও অফলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। যাদের জন্য সম্ভব, তারা ইন্সটিটিউটে এসে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে এবং বাকিরা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য থেকেও যোগ দিচ্ছে। এমনকি ২০১৪ সালে তিনি বাংলাদেশেও পিপল এন্ড টেকের ইন্সটিটিউট স্থাপন করেছেন যার মাধ্যমে প্রায় ৬০০০ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে। তাঁর কাছ থেকে আমরা জানতে পারি, ২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠানের পেছনে তিনি ১.৫ মিলিয়ন ডলারের মত নিজস্ব অর্থ খরচ করেছেন, অর্থাৎ যাদের তিনি এখানে পড়িয়েছেন, তাদের বেশিরভাগকেই শিক্ষাবৃত্তির মাধ্যমে পড়িয়েছেন।

তিনি বলেন, এই প্রতিষ্ঠানকে তিনি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখেন না, বরং মানুষের জীবন পরিবর্তনের জন্য তৈরি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবেই এটাকে পরিচালনা করেন। বাংলাদেশে প্রায় ১৬২ এর মতো বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সরকারি এবং বেসরকারি মিলিয়ে যেখান থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী পাশ করে বের হচ্ছে। কিন্তু সবাই কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাচ্ছে না, বরং তারা সরকারি চাকরির দিকে ঝুঁকছে। এর পেছনে যেমন দক্ষতার অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে চাকরি স্বল্পতা। এর ফলে যারা সরকারি টাকায় ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হয়েছে তারা সমাজে তাদের অবদান রাখতে পারছে না। সেক্ষেত্রে তাঁর এই প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করে নিজেরা এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করছে যার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও প্রযুক্তি বাংলাদেশে আসছে। এমনকি আবুবকর হানিপ নিজেও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়কে তাদের দক্ষতাকেন্দ্রীক শিক্ষা কার্যক্রম পরিকল্পনা করার ক্ষেত্রে সাহায্য করছেন।


নিজের সাফল্য নিজে তৈরিতে বিশ্বাসী পরিবর্তনের এই কারিগর চিন্তা করেন একটু ভিন্নভাবে। তাই তো ওরাকল কর্পোরেশনের মত প্রতিষ্ঠানের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে দিতেও দ্বিধা করেন নি। তিনি জানান, এতদিনে হয়ত পরিচালকও হয়ে যেতেন সেখানে, কিন্তু তিনি বরাবর শুধু নিজের নয়, অন্যান্য মানুষের জীবনেও পরিবর্তন আনতে চেয়েছেন। এ কারণেই তার সব প্রতিষ্ঠানেই হাজার হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। যাদের খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই, তাদের শিক্ষা খরচ তিনি নিজ উদ্যোগে চালিয়ে নিচ্ছেন। এমনকি নিজের তিন মেয়েকেও নিয়মিত বাংলাদেশের ব্যাপারে জানাতে এবং বাংলাদেশকে তাদের মাতৃভূমি হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিতে তিনি কাজ করছেন। কারণ, ভবিষ্যতে যদি তারা বড় বড় পদে অধিষ্ঠিত হয়, তাহলে সেখানে তারা বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।

বিকশিত চিন্তাধারা ও উচ্চশিক্ষার ছাপ আবুবকর হানিপের পারিবারিক জীবনেও রয়েছে। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করতে চলেছে। মেজ মেয়ে ল্যাংলিতে ক্লাস ৯ এ পড়ছে এবং ছোট মেয়ের বয়স ৬ বছর। স্ত্রী ফারহানা হানিপ শুরু থেকেই তাঁর সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছেন। এমনকি, সেই শুরুর দিনগুলোতে, যখন নিজেদের বাড়িতে ৩০-৪০ জনের মত প্রশিক্ষণার্থীর নিয়মিত সমাগম হত, তখন ফারহানা হানিপ নিজে রান্না করে বা খাবার এনে সবাইকে খাওয়াতেন। তিনি এই পুরো সময়টাতে ধৈর্য সহকারে স্বামীর পাশে থেকেছেন এবং সবকিছু পরিচালনায় সাহায্য করেছেন। আবুবকর হানিপ মনে করেন, তাঁর স্ত্রীর পরিপূর্ণ সহায়তা ও পাশে থাকার ফলেই আজ পিপল এন্ড টেক সহ অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান দাঁড়িয়ে আছে। ফারহানা হানিপ এখনও পরিপূর্ণভাবে একজন কার্যনির্বাহক হিসেবে সকল প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত আছেন। আবুবকর হানিপ তার জ্ঞান ও অর্জিত অভিজ্ঞতা মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চান এবং মৃত্যুর আগে তার অর্জনগুলো মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতে চান। নিজের বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি বাংলাদেশিদের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচয় দেন এবং এই বিশ্ব্যবিদ্যালয়ের মাধ্যমে আমেরিকায় যেন ছাত্রছাত্রীরা প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করে মধ্য থেকে উচ্চস্তরের চাকরি অর্জন করতে পারে এই কামনা করেন। তিনি চান এই মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশকে বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি দিতে। ভিন্নধর্মী এই শিক্ষকের প্রত্যাশা, নিজের মৃত্যুর পরও যাতে মানুষের মনে তিনি বেঁচে থাকেন। তাঁর এই বিশ্ববিদ্যালয় যেন একদিন বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় জায়গা করে নেয়, যাতে করে তিনি নিজের এই কাজগুলোর মধ্য দিয়ে মানুষের কাছে স্মরনীয় হয়ে থাকেন, এটাই তাঁর চাওয়া। তার এই চাওয়া যেন শতগুণে সত্য হয়, তার এই মহান উদ্যোগগুলো যেন সফল হয়, এই প্রত্যাশাই রইল।

-শেষ-