শফিক চৌধুরী: বাংলাদেশকে মহাকাশে পৌছে দেয়ার কারিগরদের একজন

শফিক চৌধুরী: বাংলাদেশকে মহাকাশে পৌছে দেয়ার কারিগরদের একজন

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে বাংলাদেশের জয় যেন শুধু স্থল বা জল পথেই সীমাবদ্ধ না থাকে, স্বপ্ন যেন আকাশ ছাড়িয়ে মহাকাশ ছুঁতে পারে সেই চেষ্টায় একাগ্রচিত্তে কাজ করেছেন একদল মানুষ। বলছি মহাকাশে বাংলাদেশের নিশান উড়ানো দেশের প্রথম স্যাটেলাইট – ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ এর কথা। যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ব্রডকাস্টিংয়ে আমাদের পরনির্ভরশীলতা কমে এসেছে। এই স্বপ্নযাত্রার বৈদেশিক পরামর্শক, শফিক চৌধুরীকে নিয়ে আমার আজকের আড্ডা। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে কর্পোরেট বিশ্বের নানা বিষয়ের ওপর পারদর্শীতা অর্জন করেছেন জনাব শফিক চৌধুরী। চট্টগ্রামের ছেলে শফিক চৌধুরি পড়াশোনা জীবনের শুরুতে ছিলেন বাংলাদেশের ক্যাডেট কলেজে, সেখান বিদেশে পাড়ি জমিয়ে পড়াশোনা করেছেন বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটি, জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ডের মত বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে।

কিছুদিন পূর্বেই হার্টের অপারেশন হয়েছে শফিক চৌধুরীর। অসুস্থ্যতা সত্ত্বেও আগের মতই নিজের কর্মতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। তিনি জানান একজন সায়েন্টিস্ট হিসেবে বিজ্ঞানের ওপর আস্থা রেখে অপারেশন পরিচালনার ভার ছেড়ে দেন রোবটের ওপর। এই পদ্ধতিতে মাত্র ৬ সপ্তাহের মধ্যে সম্পূর্ণ সুস্থতা লাভ করে স্বাভাবিক কর্মজীবনে ফিরে আসেন তিনি।

এবার আমার ও প্রায় সকলের মূল আগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সম্পর্কে জনাব শফিক এ চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলাম। ‘ভারতীয় আইএসআরও’ বা ইলোন মাস্কের ‘স্পেস-এক্স’ আমাদের মাথার উপর কাজ করে যাওয়ার পরেও, ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের কি আদৌ প্রয়োজন ছিল কিনা সে বিষয়ে উনার মতামত জানতে চাইলে প্রথমেই জনাব শফিক চৌধুরী জানালেন তিনি নিজেই বেশ অবাক হয়েছিলেন বাংলাদেশের মতো ছোট দেশে স্যাটেলাইটের কথা শুনে। দেশীয় না হয়ে আঞ্চলিক একটি স্যাটেলাইট হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের যাত্রা শুরু হয় বলে জানান তিনি। এর ফলে বিদেশী নির্ভরশীলতা কমে এসেছে এবং দেশের অর্থ দেশেই থাকছে বলে অভিমত জানান তিনি। ব্যবসায়িক লাভের পাশাপাশি গৌরবের দিক থেকে চিন্তা করলেও এটি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে অনন্য একটি পর্যায়ে পৌছে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি। গার্মেন্টস শিল্পে বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে শীর্ষ অবস্থানে আছে এ বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান এভাবে আমাদেরকে সকল ক্ষেত্রেই এগিয়ে যেতে হবে।

বর্তমানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ এর সামার্থের পঞ্চাশ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে কিন্তু তবুও নতুন করে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -২ নির্মান প্রস্তুতির যৌক্তিকতা কতটুকু এ সম্পর্কে তিনি জানান এখন প্রথম স্যাটেলাইটের সামার্থ্যের পঞ্চাশ শতাংশের বেশিই ব্যাবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের ৩৬ টি টিভি স্টেশন এটি ব্যবহার করছে। স্যাটেলাইট ডিজাইনের খুঁটিনাটি সম্পর্কে আলোচনার সময় তিনি জানান, এর ডিজাইনে তারা ৪টি বিম ব্যবহার করেছেন। একটি বাংলাদেশের জন্য; যেটার পাওয়ার অনেক বেশি। যার মাধ্যমে মাত্র ৫০ সেন্টিমিটার এন্টেনা দিয়ে টিভি দেখা যাবে৷ আরেকটি বিমের কথা জানালেন, যা সার্কভুক্ত দেশগুলো কাভার করে, আরেকটি ইন্দোনেশিয়া ও অন্যটি ফিলিপাইন কাভার করে বলে তিনি জানান। সমস্যার কথায় তুলে ধরেন, বাংলাদেশের কারো তেমন স্যাটেলাইট নিয়ে জ্ঞান ছিল না। একদল তরুণকে স্যাটেলাইট সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানার সুযোগ করে দিয়ে বিদেশ পাঠানো হয়। তাদেরও একটু সময় লেগেছে সব কিছু ভালোভাবে বুঝতে। মাত্র ৩-৪ বছর হয়েছে, আরও সময় আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমানে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে কিছু ট্রান্সপন্ডার বিক্রির কথা চলছে বলে তিনি জানান। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর বিষয়ে তিনি বলেন, এটি একটি রাজনৈতিক স্ট্যান্ড। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট- ২, যেটি নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছিল সেটি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ১ এর মতো না বলে জানান তিনি। ‘বিএস-২’ মূলত হবে আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট।

জনাব শফিক এ চৌধুরীর কাছ থেকে আমরা জানলাম, পৃথিবী যেমন ঘোরে, স্যাটেলাইট তেমন ঘোরে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নর্থ সাউথ পোলে ঘোরে। কয়েকটি কন্সিলেশন থাকলে প্রতি ৪/৬ ঘন্টা করে ছবি তুলতে পারে এই ধরনের স্যাটেলাইট। যার মাধ্যমে কেউ অসুদপায়ে বর্ডার ক্রস করছে কি না, নদীর পানির ওঠা নামা খুব সহজে দেখা যাবে বলে তিনি জানান। এইটা নিয়ে গভর্মেন্ট টু গভর্মেন্ট আলোচনা চলছিল কিছুদিন, রাশিয়া সরকারের সাথে মূলত। এটা নিয়ে টাকা পয়সার কোনো সম্পর্ক থাকবে না, সেই বিষয়েও আমাদের জানান, মূলত একপ্রকার লেনদেন। জনাব শফিক জানালেন, ইউক্রেন যুদ্ধের পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, ওই চুক্তিটা হবে না। এর ফলশ্রুতিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ হচ্ছে না, তা তিনি পরিষ্কার ভাবে বুঝিয়ে বললেন। তবে আগামী নির্বাচনের আগে বর্তমান স্যাটেলাইটের সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যাক্ত করেছেন।

আমেরিকার আলাস্কাতে শফিক চৌধুরীর ‘আলাস্কা ডাটা বোর্ড’ নামে আরেকটি স্যাটেলাইট প্রজেক্ট রয়েছে। এটি ইলন মাস্কের স্পেস এক্সের সাথে তার প্রতিযোগিতা শুরু করবে কিনা বা মাথার ওপর স্টারলিংকের ৫৫টি স্যাটেলাইট থাকার পরেও এ প্রজেক্টের উদ্দেশ্য কী এসব বিষয়েও আলাপ করেছেন তিনি। তিনি জানান, ইলন মাস্ক অত্যন্ত উন্নত চিন্তার মানুষ এবং তার সবার কাছে ইন্টারনেট পৌছে দেয়ার চিন্তার প্রশংসা করেন তিনি। নিজের প্রজেক্টের বিষয়ে বলতে গিয়ে জনাব শফিক বলেন, স্টারলিংক সার্বজনীন নয়, তার প্রজেক্টটি এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, আলাস্কার মত বসবাসের জন্য কষ্টকর স্থানে সবার কাছে ইন্টারনেট পৌছে দিতে পারলে তা ঐ অঞ্চলের মানুষের অনেক উপকারে আসবে এবং শহরের বিকেন্দ্রীকরণের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নতি ঘটবে।

স্যাটেলাইট ডিজাইনের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতেই পদচারনা রয়েছে শফিক চৌধুরীর। বর্তমানে তিনি ও তার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ’র (এইআইএইচ) ডাক্তার বন্ধুসহ এডিএবিএটিই নামের একটি ক্লিনিক্যাল ডিভাইস নিয়ে কাজ করছেন। এ ডিভাইসের মাধ্যমে মেডিক্যাল ট্রায়ালে ব্যবহৃত বানরগুলোকে মেরে না ফেলে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা যাবে বলে জানান তিনি। বর্তমানে এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে আছে বলে জানান তিনি। এছাড়াও, কোভিডের সময় থেকে তিনি নতুন মাল্টি পেশেন্ট ভেন্টিলেটর উদ্ভাবনের কাজ করে আসছেন। এটিও একটি মেডিক্যাল ডিভাইস যা দিয়ে একসাথে চারজন রোগীকে অক্সিজেন সাপ্লাই দেয়া যাবে বলে জানান তিনি।

দশ বছর পরে শফিক চৌধুরী তার জন্মভূমি বাংলাদেশকে কোথায় দেখতে চান এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি দেশের জনশক্তি নিয়ে ইতিবাচক প্রত্যাশা ব্যাক্ত করেন। তিনি দাবি করেন বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত বুদ্ধিমান এবং সঠিক দিক নির্দেশনা পেলে এ দেশের তরুনরা অনেক দুর এগিয়ে যাবে। তবে গার্মেন্টস শিল্পের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হওয়া থেকে বেরিয়ে এসে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও দৃষ্টি দেয়ার জন্য পরামর্শ দেন। তিনি মনে করেন, কোনো একটা খাত নিয়ে কাজ করতে গেলে সে বিষয়ের ওপর স্পেশালাইজড শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা জরুরী।

শফিক চৌধুরী তার জীবনে বহু আইডিয়া ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন এবং এখনও করে যাচ্ছেন। তার কাজের অনুপ্রেরণা হিসেবে তিনি তার পছন্দের ব্যাক্তিত্ব বিল ক্লিনটনের জীবন থেকে পাওয়া একটি শিক্ষার কথা তুলে ধরেন। বিল ক্লিনটন থেকে তিনি শিখেছেন কিভাবে ব্রেনের দশটি ভাগকে কাজ ও সময় অনুসারে আলাদাভাবে ভাগ করে ব্যবহার করা যায়। তিনিও বিগত ১০ বছরে এটি রপ্ত করেছেন। এভাবেই তিনি একজন মাল্টি টাস্কিং মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছেন। কাজের ফাঁকে তিনি বাগান করতে পছন্দ করেন এবং রান্না বান্না করতে পছন্দ করেন। এছাড়াও, জনাব শফিক চৌধুরী অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন স্টিভ জবস, ইলন মাস্ক ও বিল গেটসের কথা। তাদের আবিষ্কার যেভাবে সময় বাঁচাচ্ছে ও সমাজের অগ্রগতিতে কাজ করছে তার প্রশংসা করেছেন তিনি।

সবার জীবনের শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ। সেই জায়গাতে জনাব শফিকের কাছেও জানতে চাওয়া তার জীবনের শুরুর দিকের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সম্পর্কে। তিনি প্রথমেই জানালেন বাবা-মায়ের কথা। পাশাপাশি বললেন তার পরিবারের ঐতিহ্যের কথা, প্রায় ১৬০০ বছরের ইতিহাস। পরিবারে পড়ালেখার উপর জোর সবসময় ছিল বলে তিনি জানালেন। এখানে যেই বিষয়টি নজরকাড়ে, একসাথে খেতে বসে তার বাবার পড়ালেখা নিয়ে খোঁজ করা। তিনি তার বাবার এই উৎসাহের কথাটি বারবার করে উল্লেখ করেছেন।

আড্ডার মাঝে জনাব শফিক বলেছিলেন, রান্না করতে ভালোবাসেন, তাই জানতে চাওয়া কি ধরনের রান্না করা তার পছন্দের। এই প্রশ্নে যেন জনাব শফিক সাহেব একটু পুরাতন সময়ে ফিরে গিয়েছিলেন। পড়ালেখার সুবাদে বাড়ি ছাড়লেও মায়ের হাতের রান্না মিস করতেন তিনি। সাড়ে আঠারো বছরে বিদেশ পাড়ি জমানোর পর থেকেই নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশীয় রান্না করতেন তিনি। অনুষ্ঠান উপলক্ষে বিশেষ রান্না বা সাধারন যেকোনো রান্না করতে পছন্দ করেন তিনি। জনাব শফিক জানান যে দেশীয় চলচ্চিত্র দেখার তেমন একটা সুযোগ হয়ে ওঠেনা ওনার। তবে একটা সময় আরটিভি ও এনটিভিসহ বিভিন্ন চ্যানেলের অনুষ্ঠানগুলো উপভোগ করতেন তিনি। পাশাপাশি তার আলোচনায় উঠে আসে সরকারি কাজে বেতনের পাশাপাশি নির্দিষ্ট প্রজেক্টের লাভ্যাংশের অংশ কর্মরত ব্যক্তিদের সাথে শেয়ার করার মাধ্যমে বা অন্য কোনো ভাবে ইনসেনটিভ দেয়া প্রয়োজন।

ব্যক্তি শফিক চৌধুরী একজন বরেণ্য ও কৃতি মানুষ হিসেবে তার জন্মভূমি বাংলাদেশের জন্য কী কী অবদান রেখে যাচ্ছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ক্যাডেট কলেজের শিক্ষার্থীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটে ভর্তি হওয়ার পরিমান বাড়ানোর লক্ষ্যে একটি ই-লার্নিং সেন্টার গড়ে তোলার কথা জানান। পাশাপাশি ২০২২ সালে তিনি একই আদলে “স্যালুট টু বাবা” ই-লার্নিং সেন্টার গড়ে তুলেছেন স্কুলের শিক্ষার্থীদের জন্য। স্কিল উন্নয়নের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও বিভিন্ন কোর্সের জন্য কাজ শুরু করেছেন তিনি। অত্যন্ত বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ শফিক চৌধুরী আশা রাখেন যেন তাঁর মৃত্যুর পরেও মানুষ তাঁকে একজন আদর্শ ও ভাল মানুষ হিসেবে মনে রাখেন।

বিবি রাসেল: পোশাক শিল্পের বাঙালী শিল্পদূত

বিবি রাসেল: পোশাক শিল্পের বাঙালী শিল্পদূত

আজকের আড্ডা ছিল এমন একজন মানুষের সাথে যিনি পাশ্চাত্যের খ্যাতির উচ্চ শিখরে থেকেও মাতৃভূমির টানে দেশে ফিরে এসেছেন অবলুপ্ত প্রায় পোশাক শিল্পকে বিশ্ব দরবারে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে৷ তিনি আর কেউ নন, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন মডেল, ফ্যাশন ডিজাইনার, উদ্যোক্তা ও সর্বোপরি বাংলাদেশের গর্ব – বিবি রাসেল। চট্টগ্রামের মেয়ে বিবি রাসেল কামরুন্নেসা সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও আজিমপুরের গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে পড়াশোনা শেষে পাড়ি জমান ইংল্যান্ডে। লন্ডনের কলেজ অব ফ্যাশন অ্যান্ড ডিজাইন থেকে পড়াশোনা শেষ করে যাত্রা শুরু করেন মডেলিং পেশায়। মডেলিংয়ের বর্ণাঢ্য জীবনে তিনি ভোগ ও কসমোপলিটনের মত জনপ্রিয় ম্যাগাজিনের টপ মডেল ছিলেন এবং টয়োটা ও জাগুয়ারের মত ব্র্যান্ডের জন্যও মডেলিং করেছেন। বিদেশের আকাশচুম্বী তারকা খ্যাতিকে পাশে রেখে দেশীয় পোশাকের নব যুগের সূচনার স্বপ্নে বাংলাদেশে ফিরে আসেন ১৯৯৪ সালে। ফিরে আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি কাজ করে চলেছেন বাংলার গ্রামে-গঞ্জে তাঁতী ও বুনন শিল্পীদের সাথে এবং গড়ে তুলেছেন ‘বিবি প্রোডাকশন’ নামে নিজস্ব একটি ব্র্যান্ড। সৃষ্টি করেছেন দেশীয় পোশাকশিল্পের অনন্য সৃষ্টি গ্রামীণ চেক ও গামছা এবং নতুন প্রাণ দিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী খাদি ও মসলিন কাপড়ের। অক্লান্ত পরিশ্রমের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বাংলা একাডেমীর সম্মানিত ফেলোশিপ, এল ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা নারী ও বেগম রোকেয়া পদকসহ দেশে বিদেশে বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। তার ফ্যাশনকে ইউনেস্কো নাম দিয়েছে ‘ফ্যাশন ফর ডেভেলপমেন্ট’ হিসেবে।

কথার শুরুতেই বিবি আপা তার কাজ নিয়ে বলেছিলেন, যার যাত্রা শুরু একদম গ্রাম থেকে। বলছিলেন কীভাবে গ্রামবাংলার মানুষের সাথে তার জীবন মিশে আছে। করোনা মহামারীতে তাঁতী ও বিভিন্ন হস্তশিল্পে জড়িত মানুষদের কষ্টের গল্প বলছিলেন। তার সময় কি করে যায় এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান যে কাজ করার স্পৃহা, পোশাক শিল্প নিয়ে নানা ধরনের গবেষণা, আর গ্রাম-বাংলার মানুষের সাথে কাজ করেই তার জীবন কেটে যাচ্ছে। পরিবেশ দূষণের গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে তিনি কৃষি ও তাঁতের পাশাপাশি সহাবস্থানের মাধ্যমে পরিবেশ বাঁচানোর কথা জানান। তার এই দীর্ঘদিনের যাত্রায় তার চেষ্টা ছিল গ্রামের সাধারণ মানুষকে বোঝানো যে কোনো জাতির জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দুটি বিষয় তার তৈরি সকল পণ্যে প্রাকৃতিক ফাইবার ব্যবহার করে যাওয়ার বড় অনুপ্রেরণা। আড্ডায় বিবি আপা আমাদের সাথে ভাগাভাগি করে নিলেন তার স্পেনের একটি স্মৃতি। আপা জানালেন কিভাবে স্পেনের মানুষেরা তার কাজ ও বাংলাদেশের হস্তশিল্পি তাঁতীদের প্রশংসা করেছেন এবং আপার কাজের অনন্যতা ও বিশুদ্ধতা কিভাবে তাদের মনে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। উদ্যোক্তা বিবি রাসেলের সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে দরিদ্রতা থেকে মুক্তির সংগ্রামের এই যাত্রার ভূয়সী প্রশংসা করেছে স্পেনের জনগন।

লন্ডন কলেজ অফ ফ্যাশান থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর বিবি রাসেলকে দেখা গেছে ভোগ, কাসমোপালিটান, হারপাস বাজার, ভ্যালিচিনো ও নানা বড় প্রতিষ্ঠানের হয়ে র‍্যাম্পে ক্যাটওয়্যাক করতে। তাই জানতে চেয়েছিলাম এই ঝলমলে চাকচিক্যে ভরা জীবন ফেলে বাংলাদেশে আসার অনুপ্রেরণা কী? তাঁর ছিল খুবই সরল উত্তর, তার অনুপ্রেরণার উৎস গ্রাম- বাংলার সাধারন মানুষ। তিনি এটাও বলেন যে মূল শিক্ষাটা নিজের ঘরের। ছোটদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে বাড়ির শিক্ষার গুরুত্বের কথা তুলে ধরে তিনি তাঁর ফ্যাশাব ডিজাইনে পড়ার পিছনে বাবা-মায়ের আস্থা ও অবদানের কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি আরও জানান ছোটবেলার স্বপ্ন লালন করে যাওয়ার কথা, তার সাথে তার স্বপ্নের বেড়ে ওঠা। স্বপ্ন পূরণের আত্নতৃপ্তির সুর ছিল তার কন্ঠে। আরো বলছিলেন ওয়ার্ল্ড মিডিয়ার কথা, যারা তাকে ফিচার করেছেন, গল্প তুলে ধরেছেন তাদেরকে সরাসরি সাপোর্টার মনে করেন তিনি। পৃথিবীর প্রায় সব দেশ যেখানে শিল্পের মর্যাদা ও খ্যাতি আছে, সেসব জায়গা থেকে এ অঞ্চলের একজন শিল্প অনুরাগী হিসেবে দাওয়াত পান তিনি। আদর আপ্যায়নের শেষে তিনি কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই এসব মানুষদের জন্য কনসালটেন্সি করেন। তাঁর খ্যাতির জন্য অনেকেই তাঁকে বিদেশে নিয়ে যেতে চান। কিন্তু কৃতজ্ঞ চিত্তে তিনি জানান যে, যাদের জন্য তিনি বিবি রাসেল হয়েছেন তাদের ছেড়ে তিনি কোথাও যাবেন না।

বিবি রাসেল তাঁর পেশা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জানান এই পেশার মাধ্যমে তাঁর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছে। অন্য দেশের ভাষা, কৃষ্টি ও সংস্কৃতি সরাসরি দেখার সুযোগ হয়েছে তাঁর। এভাবে আন্তঃদেশীয় সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে সব দেশের মধ্যে নিজের কাজের অনন্য দিক ও এ অঞ্চলের পোষাক ও ফ্যাশনের বিশেষত্ব তুলে ধরা যায় বলে মনে করেন তিনি৷ হারিয়ে যাওয়া খাদি কাপড়কে যেভাবে তিনি নতুন করে দেশের মানুষের কাছে আবার ফিরিয়ে এনেছেন একইভাবে মসলিনকেও ফিরিয়ে আনার ইচ্ছা আছে ওনার। তিনি জানান আসল মসলিনের ম্যাচের বক্সে ফিট হওয়ার গল্প তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয়। মসলিনের কাপড়ের ওপর তাঁর গবেষণা ২৫ শতাংশ অগ্রগতির কথাও বলেন তিন এবং একইসাথে থেমে না থাকার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। সময়ের সাথে প্রযুক্তির উন্নতির মতো এই পোশাক ও হস্তশিল্পের এগিয়ে নেওয়ার জন্য তাগাদা দেন তিনি।

কথার মাঝে বিবি রাসেল দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে, প্রতিবছর বইমেলায় এতো বই প্রকাশ হওয়ার পরেও মসলিন নিয়ে গবেষণা ধর্মী বইয়ের বড় অভাব। তবে অনেক কষ্ট করে নানা রিসোর্স ব্যবহার করে জাদুঘর থেকে ফটোকপি করে পড়েছেন তিনি। মসলিন নিয়ে পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তিনি জানান যে, তিনি সবসময় যেকোনো পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতার কথা বিবেচনায় রেখে কাজ করেন। তাই উনি ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতি। এই প্রক্রিয়ার সাফল্যের উদাহারন হিসেবে তিনি তুলে ধরেন গামছার কথা।
বিদেশে পড়াশোনার কথায় জানালেন, পোস্ট বিলি করে, অতিরিক্ত কাজ করে নিজের পড়ার খরচ চালিয়েছেন তিনি।

তাঁর হাত ধরে তাঁতীদের পুনর্বাসন ও মৌলিক শিক্ষার কাজ চলছে। বিবি রাসেলের কাজের পরিধি শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, ভারতের লিলুয়া হোমসে নারীদের পুনর্বাসন থেকে শুরু করে এসিড ভিক্টিম নারী ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শরনার্থী, সর্বত্রই আলোকবর্তিকা হাতে ছুটে চলছেন তিনি। লিলুয়া হোমসের কাজের অভিজ্ঞতার গল্প বলছিলেন। সেইসব নারীদের ক্ষমতায়ন, তাদেরকে জীবনের কঠিন বেড়াজাল থেকে বের করে দক্ষ করে রোজগারের জন্য গড়ে তোলার যাত্রার গল্প শুনছিলাম। আড্ডায় তাঁর সম্পর্কে আরেকটি বিষয় জানলাম, উনি দিনে মাত্র ৪ ঘন্টা ঘুমান। যদিও কোনো বিরক্তি নেই উনার এতে৷ বাজারে দোকানের সংখ্যার বিষয়ে তিনি একটা অসাধারণ যুক্তি দাড় করিয়েছেন। তিনি জানান একটি দোকানের ভাড়া দেয়ার বদলে উনি আরো কয়েকজন তাঁতীকে বাঁচাতে চান। তাই তার দোকানের সংখ্যা কম কিন্তু তার পরিবর্তে তার কাজের সংখ্যা বেশি। তিনি বলছিলেন তাকে নিয়ে বানানো ডকুমেন্টারি ও চলচিত্রের কথা। গাফফার চৌধুরী ছাড়া বাংলাদেশে কেউই তাকে নিয়ে কাজ করেননি। তবে বাংলাদেশের বাইরে এ সংখ্যাটা অনেক বড়। এক্ষেত্রে নিজের একটু নাম করে, দেশকে তুলে আনার স্বপ্ন দেখতে পারা মানুষটা আমাদের বিবি। তাকে নিয়ে বানানো চলচিত্রে যখন বলা হচ্ছে সামনে দশ বছরে আরো ১০০ বিবি রাসেল হবে, কিন্তু বিবি রাসেল নিজেই চান না৷ কারণ উনি চান না কেউ তার মতো কষ্টে পড়ুক।

বিবি রাসেল ও ডঃ ইউনুস একই এলাকার মানুষ, চট্টগ্রামে জন্ম। বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরেছেন দুইজন। একজন গ্রামীণ চেক আরেকজন গ্রামীন ব্যাংক এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে করেছেন সম্মানিত। বিবি রাসেল যদিও নিজেকে ডঃ ইউনুসের সাথে তুলনা করতে নারাজ। ডঃ ইউনুসকে তিনি মাইক্রো ক্রেডিট এর গডফাদার হিসেবে মন করেন৷ ডঃ ইউনুসের কাজ প্রসঙ্গে বলছিলেন গ্রামীন ব্যাংকের কাজ হয় অনেক বড় পরিসরে, আর তাদের তুলনায় তাদের কাজ নির্দিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে। তিনি বলছিলেন কীভাবে তিনি নিজের অফিসের সকলকে হাতে ধরে কাজ শিখিয়েছেন৷ তিনি প্রত্যাশা করেন তাঁর মৃত্যুর পরে অফিসের লোকেরাই যেন এটি ধরে রাখতে পারেন।
বিবি রাসেল আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান তার সবচেয়ে বড় শক্তি বাংলাদেশের ৫০ ভাগ জনগণ৷ বডিগার্ড ছাড়াও নির্বিঘ্নে তিনি দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন, ভালোবাসায় মিশে আছেন মানুষের সাথে। অনেক তাঁতীর ভারতে চলে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন করায় তিনি জানান, আমাদের চাইতে ওদের কোয়ালিটি বেশি ভাল। তিনি আক্ষেপ নিয়ে জানান বাংলাদেশে রিসোর্স সীমাবদ্ধ ও হাতে ধরা অল্প। তবে একইসাথে তিনি জানান বাংলাদেশের শিল্পীরা অনেক মেধাবী।

মডেলিং নিয়ে কথায় বলছিলেন, বাংলাদেশের মানদন্ডে বেখাপ্পা একটি মেয়ে বিদেশের ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় মধ্যমণি হয়ে উঠছিলেন। তিনি জানালেন বাংলাদেশি হিসেবে তাকে মডেলিং এ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশের কাছে তিনি কৃতজ্ঞ। নোবেল পুরষ্কারের আশা করেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন বাংলার মানুষের ভালোবাসাই তার পুরষ্কার। পছন্দের ডিজাইনারের কথা জিজ্ঞেস করায় জানালেন একেকজন স্বতন্ত্র ভাবে তাদের ধারায় সুন্দর। তিনি অনেক তরুণদের নতুন নতুন কাজের প্রশংসা করলেন। তাদেরকে পরামর্শ দিয়েছেন তাদের সৃজনশীল কাজকে ধরে রাখার। তরুণদেরকে তাদের মেধার ব্যবহার করে শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার তাগিদ দেন তিনি। পরবর্তী প্রজন্মকে অনেক গুরুত্ব দিয়ে বলেন যে তাদেরকে শিখতে হবে, জানতে হবে, সম্মান করতে হবে, নিজেদের কৃষ্টি সংস্কৃতি নিয়ে জানতে হবে। সম্মান নিয়ে একাগ্রচিত্তে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। নিজের সম্পদ, ভাষ ও সংস্কৃতি নিয়ে প্রথম যেন তরুণরা গর্ব করে ও হতাশ না থাকে সেই উপদেশ দিয়েছেন তিনি। স্বমহিমায় আলোকিত এই সফল উদ্যোক্তা বিবি রাসেল আলোচনা শেষ করেন তরুণদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়ে। তিনি প্রত্যাশা করেন ভবিষ্যতে তরুণদের ডিকশনারিতে “লোভ” শব্দটি যেন না থাকে।


Photo| Future Startup

কৃতী মানুষের গল্প: ড. আসিফ নজরুল

কৃতী মানুষের গল্প: ড. আসিফ নজরুল

ড. আসিফ নজরুল বাংলাদেশের মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও পছন্দের একজন মানুষ। স্পষ্টবাদী এ মানুষটি একাধারে একজন শিক্ষক, লেখক, ঔপন্যাসিক, রাজনীতি-বিশ্লেষক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও কলামিস্ট। জীবিকাসূত্রে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পূর্বে আসিফ নজরুল ও আমি একই অফিসে সহকর্মী ছিলাম। দীর্ঘদিনের পুরনো এই গুণী সহকর্মীর সাথে ৩০ বছর পর কথা বলতে পেরে সত্যিই অনেক ভাল লাগছিল। আসিফ নজরুলের নামটা শুনতে এখন অনেক ভারিক্কি লাগলেও আমার কাছে এখনো আসিফ নজরুল মানে সেই তারুণ্যে ভরপুর সাংবাদিক, সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রদায়ক, কয়েক ঘন্টার নোটিশে যার কাছ থেকে আসে দুর্ধর্ষ কাভার স্টোরি।

তবে তার নাম আসিফ নজরুল হওয়ার গল্পটা বেশ চমৎকার। তার আসল নাম মোঃ নজরুল ইসলাম। বিচিন্তায় তিনি লেখালেখি শুরু করেন, সম্পাদক ছিলেন মৃণাল মাহমুদ, উনি প্রায়শ বিরক্ত হতেন তার এই নামের জন্য। কারণ তার সার্টিফিকেটের নামটা বাংলাদেশে ছড়াছড়ি, তার ভালো লেখাগুলোর ক্রেডিট কোন নজরুল ইসলামের কাছে যায় বোঝা মুশকিল। তাই মিনার মাহমুদই তাকে নামের পরিবর্তন করতে বলেন। অতঃপর তার ছোটবেলায় যত নাম ছিল সেসব নিয়ে বসা হলো। তার বড় ভাইয়ের রাখতে চাওয়া নাম আসিফই শেষ পর্যন্ত চুড়ান্ত হলো। এভাবেই মোঃ নজরুল ইসলাম হয়ে গেলেন সবার প্রিয় আসিফ নজরুল।

ডঃ আসিফ নজরুলের জ্ঞানের পরিধিটাও বিশাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে পিএইচডি, জার্মানি থেকে পোস্ট ডক্টরাল করে দেশে ফিরে আবার সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই যোগাদান করেন শিক্ষক হিসেবে। বাইরের অর্থ ও খ্যাতি ছেড়ে তাঁর দেশে ফিরে আসার টান এবং দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তবে তার মতে তার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি দেশের মানুষের অগাধ ভালোবাসা। দেশ, জাতি, শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে ভাবেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ নিয়ে তার ভাবনা অনেককেই ভাবতে সাহায্য করবে।

তার মতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাগ্যবান একটি প্রতিষ্ঠান, সেখানে সারাদেশ থেকে মেধাবীরা এসে একত্রিত হয়। তবে তিনি মনে করেন, এখান থেকে যত মেধাবী, জ্ঞানী-গুনী বের হয়েছেন তার ক্রেডিট শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের না। বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা থেকে বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ হিসেবে মানতে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি যেই জায়গাটি বিশেষ করে দেখিয়েছেন যে, স্কুল আর কলেজের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে পার্থক্য ‘নলেজ প্রডিউস ও ইউটিলাইজ করা’, সেখানে কীভাবে পিছিয়ে রয়েছে এই বিদ্যাপীঠ। কলম্বিয়া, হার্ভাড, ইয়েল ও নামকরা নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে বড় বড় বিনোয়গকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করে, বিভিন্ন গবেষণা, নতুন আবিষ্কার হয় তাই। কিন্তু ঢাবির ক্ষেত্রে তিনি হতাশা প্রকাশ করে জানান, কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত সবাই গতবাধা বই রিডিং আর মুখস্ত পড়ায়। নলেজ ক্রিয়েশনের নিম্নমান, পুরাতন পদ্ধতিতে পাঠদানের পরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের যা সাফল্য, তিনি তার কৃতিত্ব দিতে চান শিক্ষার্থীদের।
তবে বর্তমান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কালচারাল মানের অবনতি আরও ভয়াবহ। শিক্ষার্থীদের অনেকাংশের কাজ তাকে ব্যথিত করে। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রথম রুখে দাঁড়ানো এই প্রতিষ্ঠান, অনেকাংশে তার ঐতিহ্য ভুলে গিয়েছে।

নিজের লেখালেখি ও নানা বিষয়ের জন্য বেশ কিছু নাটকীয় মামলার জালে আটকে আছেন তিনি। দেশের চিন্তা করেও আছেন যেন আরেক বিপদে। এই মামলা মোকদ্দমার ভয় কিছুটা প্রভাব ফেলেছে তার লেখালেখিতে। আগের মতো চাইলেই মন প্রাণ খুলে লিখতে পারেন না বলে জানান।

তবে এমন জ্ঞানী প্রতিভাবান মানুষ অনেকের ভালোবাসা পাবেন সেটাই সত্য। তিনি জানান ক্রান্তিকালে তিনি পাশে পেয়েছেন নানা বিশিষ্টজনকে। বিভিন্ন আইনজীবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আসিফ নজরুল। এছাড়াও সুশীল সমাজের কথার উল্লেখ করেন তিনি।

কথা হচ্ছিল দেশের দুই নেত্রীকে নিয়ে৷ আলাপের মধ্যে একটা ইন্টারেস্টিং বিষয় তুলে ধরেন তিনি। তার মতে দেশ ও বিদেশি কিছু কুচক্রী মহল এই দেশের দুই নেত্রীর মধ্যে বৈরী সম্পর্ক তৈরীতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। কারণ এতে সেই সব মানুষের স্বার্থ উদ্ধার হয়, বাংলাদেশকে দুর্বল করে। এই দুই নেত্রীর আশেপাশের স্বার্থান্বেষী মানুষগুলোই এই বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, এই সম্পর্কের ফাটল হলে তাদের লাভ। তার মতে, যদি এই দুই নেত্রীর মধ্যে সুসম্পর্ক ও পারস্পরিক সম্মানবোধ থাকতো তবে দেশের আরও অগ্রগতি হতো। কথা হচ্ছিল দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উপদেষ্টা প্যানেল নিয়ে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন যে দেশে সৎ, নিষ্ঠাবান ও নির্মোহ লোক থাকা সত্ত্বেও দেশের বড় বড় এনজিও ও প্রতিষ্ঠানে তাদের কাজে লাগানো হয়না। গুনী লোকের কদর এদেশে যথাযথ হয়না তা নিয়ে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।

ধর্ষকের ফাঁসি নিয়ে যখন বাংলাদেশের নানা মঞ্চ যখন সরব তখন আসিফ নজরুল প্রকাশ করেছেন ভিন্ন মত। তার যুক্তি ছিল এদেশে নারী ও শিশুরা সাধারণত ধর্ষণের স্বীকার হয় পরিচিত কারো দ্বারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই। এইক্ষেত্রে ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড দিলে তারা ভুক্তভোগীকে মেরে ফেলবে, পরিচয় প্রকাশের সাথে শাস্তির ভয়ে। তার মতে দেশে হয়রানি মূলক মামলা বেড়ে যেতে পারে। আইনের অপপ্রয়োগে ও আরো নানাধরণের বেআইনি কাজ বাড়বে। মূলত আজীবন স্বশ্রম কারাদন্ড বা নির্দিষ্ট সময়ের শাস্তি, যথাযথ ভাবে বাস্তবায়নের কথা বলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিচারের জন্য মিডিয়ায় কেন ভাইরাল হতে হবে?

ইতিহাস ও ইতিহাসের বিকৃতি নিয়ে কথা হচ্ছিল। তার মতে, ইতিহাসের তো বিভিন্ন ধারণা থাকবেই, ইতিহাস তো অংক না তাই ভিন্নমত থাকবেই। তিনি আশা করেন, সঠিক ইতিহাসের চর্চা হবে ভবিষ্যতে। একজনের নাম বলতে গেলে আরেকজনের নাম মুছে ফেলার সংস্কৃতি পাল্টাতে হবে। বিভিন্ন মহল জিয়া মুজিবের বীরত্বকে ধারণ না করে বরং সেটাকে ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থে। তবে এদেশে যে বিকৃত ইতিহাস ব্যতিত অল্পকিছু বই আছে সে বিষয়েও উল্লেখ করেন।

আরেকটি বিষয় তিনি আলোকপাত করছিলেন নেতৃত্ব চর্চার ক্ষেত্রে জাতীয় রাজনীতিতে পরিবারের বাইরের যোগ্য লোকদের সুযোগের কথা। তিনি উল্লেখ করেন, আমেরিকার নির্বাচনের কথা। তিনি জানান যে, উত্তরাধিকার কেন্দ্রিক রাজনীতি ছাড়াও সে দেশে যথাযথভাবে রাজনীতি ও সরকার পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি নিয়ে ভুল ধারণা ভাঙাতে কাজ করার পরামর্শ দেন তিনি। কথা প্রসঙ্গে ভারত বাংলাদেশর সম্পর্ক নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি আশা করেন, বন্ধুত্বের আড়ালে যেন একপাক্ষিক সম্পর্ক না হোক। সত্যিকারের সুসম্পর্ক এই দুই দেশকেই আরও দৃঢ় করবে বলে মনে করেন।

দেশ ও জাতি নিয়ে আলোচনার পর আসিফ নজরুলের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতি জিজ্ঞাসা তো কিছুটা স্বাভাবিক। প্রথমেই আসে জীবন সঙ্গীর কথা। স্ত্রী শিলাকে নিয়ে বলেন শিলা একজন ইকোনোমিস্ট, একটি এম্বাসিতে ইকোনমিক এডভাইসর হিসেবে কর্মরত আছেন। এর আগেও অনেক বড় কনসালটেন্সির কাজ করেছেন। শীলার মেধার প্রশংসায় আরেকটি জিনিস উল্লেখ করেন, তার জনপ্রিয়তা, খ্যাতির মোহ থেকে দূরে থাকার বিষয়টি। আসিফ জানান তার আরেকটি নতুন জন্ম হলে আল্লাহ যদি সুযোগ দেন তিনি শিলাকেই আবার তাঁর জীবনসঙ্গী হিসেবে চাইবেন।

আসিফ নজরুলের জীবনে আদর্শ মানুষ কারা এবং কাদেরকে তিনি আদর্শ হিসেবে মেনে চলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ইফতেখারুজ্জামান, ডাঃ কামাল, শাহাদাৎ চৌধুরী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের মত ব্যক্তিত্বদের কথা উল্লেখ করেন। দুরদর্শী ও সৃজনশীল শাহাদাৎ চৌধুরীর জিয়াউর রহমানের শাসনামল নিয়ে করা “জিয়াউর রহমান সেভাবেই দেশ চালিয়েছেন যেভাবে বঙ্গবন্ধু দেশ চালাতে চেয়েছিল” উক্তিটি এখনও আসিফ নজরুল অবাক করে। তিনি জানান ডাঃ কামালের বঙ্গবন্ধুর প্রতি লয়্যালটি, জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, বাংলাদেশের জন্মের জন্য বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগ তাঁকে অনুপ্রেরণা দেয় এবং মুগ্ধ করে।

এসবের সাথে বাংলাদেশের চলচিত্র নিয়ে কথা হচ্ছিল। তিনি জানালেন দেশীয় চলচিত্র কম দেখা হয় তার। তারমধ্যে পছন্দের সিনেমা হলো তৌকিরের শ্যামল ছায়া, তারেক মাসুদেরর অনেক ছবি এবং মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর টেলিভিশন। পছন্দের তালিকায় বিদেশী লেখক অনেক। দেশের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ, সৈয়দ শামসুল হকের কিছু বই, মশিউরের গল্প, সাবের ভাই, আনিসুল হক। বাংলাদেশের লেখকদের বিচারে তিনি নিজেকে লেখক হিসেবে এ মাইনাস গোত্রের লেখক হিসেবে মনে করেন। তবে তিনি আরও ভাল কিছু লেখার স্বপ্ন দেখে যাছেন। তিনি জানান বিচিত্রায় লেখা আর টকশো – এ দুইটা কাজ তিনি তৃপ্তি নিয়ে করতেন এবং করেন।

মৃত্যুর পরে মানুষ তাঁকে কী হিসেবে মনে রাখবে এমন কথার প্রসঙ্গে তিনি অভিব্যাক্তি প্রকাশ করেন যে ঐ সময়ে মানুষ কী ভাববে সেটি নিয়ে তিনি মোটেই চিন্তা করেন না। তাঁর কাছে ঐ সময়ের সবকিছুই অর্থহীন। তবে একজন পিতা হিসেবে তিনি চান সন্তানরা যেন তাঁর মৃত্যুর পরে কখনও তাঁর নামে কোনো খারাপ কিছু না শোনে।

সর্বপরি, আসিফ নজরুলের সাথে কথা বলতে গিয়ে সময় কিভাবে গড়িয়ে গেল টের পাইনি। এমন গুনী ও সুবক্তার কথা শুনতে কখনও ক্লান্তি আসেনা। দেশমাতৃকার প্রেমে নিবেদিত প্রাণ আসিফ নজরুলরা যেন সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারেন এ প্রত্যাশা থাকলো।


ফটো: দৈনিক যুগান্তর